রাজনীতি

মুক্তাগাছার মন্ডা

image
Mon, November 13
02:48 2017

মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান (অব.):

ණ☛ সময়টা সম্ভবতঃ ১৯৮৯ সাল। আমি তখন ময়মনসিংহ সেনানীবাসে একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত। একদিন ছুটির দিনে আমি আমার স্ত্রী এবং একমাত্র কন্যা ১১ বছর বয়স তার মুক্তাগাছায় বেড়াতে গেলাম।

ණ☛ মুক্তাগাছায় পৌঁছলাম দুপুর বেলায়। চারিদিকে সাজ সাজ রব। বড় প্যান্ডেলে যাত্রাপালার আয়োজন করা হয়েছে। রাজবাড়িকে সাজানো হয়ে উৎসবের আমেজে। এসবের আমরা কিছুই জানতামনা কেন এবং কার জন্য এতো আয়োজন? ঘুরে ঘুরে সব দেখছি। আমি কেন মুক্তাগাছায় গেলাম তার একটা কৈফিয়ত দেয়া সমীচীন মনে করি। মুক্তাগাছার মন্ডা মিষ্টি হিসাবে এর সুনাম দেশ জোড়া । যদিও ময়মনসিংহ শহরে মুক্তাগাছার মন্ডা কিনতে পাওয়া যায় তার পরেও মুক্তাগাছায় গিয়ে এই মন্ডা কেনার একটা আলাদা মজা আছে কারণ মুক্তাগাছায় গিয়ে আসল কারিগরদের দোকান থেকে মন্ডা কিনে কয়জন খায়? মুক্তাগাছায় যাওয়ার এটাও একটা কারণ ছিল।

ණ☛ মূল কারণ ছিল আকুয়ার চেয়ারম্যান। আকুয়া ময়মনসিংহ শহরের শহরতলীর একটি ইউনিয়ন। কিভাবে যেন আকুয়ার চেয়ারম্যানের সাথে আমি পরিচিত হলাম। তখন ছুটির দিনে আমি এবং আকুয়ার চেয়ারম্যান দুরের বিলে পাখি মারতে যেতাম। পাখির মধ্যে থাকতো পানকৌড়ি এবং বালিহাঁস। মাঝে মাঝে হরিয়াল মারতাম বড় পাকা রাস্তার বটগাছ থেকে। ইতিমধ্যে আমি ময়মনসিংহ শহরের রাজবাড়ি ঘুরে দেখেছি। একদিন আমি আকুয়ার চেয়ারম্যানের সাথে ময়মনসিংহের রাজবাড়ি নিয়ে আলোচনা করার সময় তিনি আমাকে কিছু বই এর সন্ধান দিলেন। আমি ঐ বইগুলো সংগ্রহ করে পড়ে মুক্তাগাছার রাজবাড়ির সাথে ময়মনসিংহ শহরের রাজবাড়ির বিষয়ে আনেক কিছু জানতে পারলাম। তো এক ধরনের অনুসন্ধিৎসায় তাড়িৎ হয়ে আমার মুক্তাগাছায় যাওয়া। অর্থাৎ ইতিহাসকে কাছ থেকে দেখার একটা ব্যাপার ছিল। তো রাজবাড়ি ঘুরে দেখছি। অনেকের সাথেই কথা হলো। জানতে পারলাম মুক্তাগাছার শেষ রাজা রাজা জীবেন্দ্র কিশোর আচার্য চৌধুরী (নামটা তাই মনে হচ্ছে) ৫৬ সালের দিকে ভারতে চলে যান। শুনলাম রাজা মুক্তাগাছায় এসেছেন কয় দিন হলো। তাঁর সম্মানেই এই আয়োজন।

ණ☛ রাজা মুক্তাগাছায় এসেছেন এটা শুনে আমার মেয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে নিবেদনের সুরে বলে বসলো আব্বু আমি রাজা দেখবো। কেন সে রাজাকে দেখবে তার এই কৌতুহলের অনেক কারণ থাকতে পারে? যেমন ওদের স্কুলের ফাংশনে ওঁ রবীন্দ্র সঙ্গীতের তালে নৃত্যে অংশ নিয়েছিল যে গানের প্রথম কলি আমরা সবাই রাজা মোদের রাজত্বে গুন গুন করে আওড়াতে শুনেছি। ঠাকুরমার ঝুলির রাজা রাণী গল্পতো আছেই। আমার মেয়ের রাজা দেখার আবদার শুনে একটু ফাঁপড়ে পড়ে গেলাম। কারণ আমি নিজেও কোনোদিন চাক্ষুষ রাজা দেখি নাই। আমার মেয়ের রাজা দেখার আব্দারকে মনে হলো ওটা যেন আমারও চাওয়া । কিন্তু লোকো লজ্জায় কিছু বলতে পারলামনা। আমার স্ত্রীর দিকে তাকালাম। বুঝতে পারলাম সেও রাজার সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়। কিন্তু মুশকিল হলো ঘড়িতে দেখলাম বেলা তিনটা। এটা রাজার মধ্যাহ্ন ভোজনের পরে বিশ্রামের সময়। এই সময় রাজাকে বিরক্ত করি কি সমীচীন হবে?

ණ☛ কাছে একজন মাঝ বয়সি সেবায়েতকে পেলাম। ওকে জিজ্ঞেস করে জানলাম রাজা কার বাড়িতে অবস্হা করছেন। আমি তাকে ঐ লোককে সংবাদ দিতে বললাম আসার জন্য। ভদ্রলোক কাছেই ছিলেন। সামনে এলে আমি তাকে আমার মেয়ের আব্দার রাজা মহাশয়কে অবহিত করতে বললাম। এটা শুনে সে খানিক ইতস্ততঃ করলো দেরী হয়ে যাবার জন্য। পরে বললেন আমি গিয়ে জানাচ্ছি রাজা মহাশয় সাক্ষাৎ দেবেন কি না? কিছুক্ষনের মধ্যে উনি ফিরে এসে জানালেন রাজা বাহাদুর আপনাদের অপেক্ষা করছেন। শুনে আমার মেয়ে মহা খুশী।

ණ☛ আমরা রাজার ঘরে প্রবেশ করলাম। রাজা মহাশয় খাটের উপরে বসা। একহারা লম্বা গড়ন । ফর্সা গায়ের রং। বয়স ৭৫ এর মতো। গায়ে আড়াআড়ি একটি দামি আলোয়ান শোভা পাচ্ছে। হাত বাড়িয়ে আমাদের স্বাগত জানিয়ে বসতে বললেন। আমার মেয়েকে খুব আদরের সাথে তাঁর কোলে বসালেন। অনেক কথা হলো। তাঁর সাথের পার্সোনাল স্টাফরা আমাদের অনেক বই দিলেন। রাজার সাথে ভারতে তিনি কেমন আছেন কি করছেন? এমন বিষয়ে অনেক কথা হলো।

ණ☛ আমরা চাই ছিলামনা এই অসময়ে রাজাকে আরো বিরক্ত করতে। তাঁর ব্যক্তিগত স্টাফরা এটা বুঝতে পেরে আমাদের জন্য উপহার হিসেবে ১ কেজি মুক্তাগাছার মন্ডা একটা প্যাকেটে করে আমাদের সামনে রাখলেন। রাজার প্রধান স্টাফ আমাদেরকে জানালেন যে মন্ডা রাজা বাহাদুর আমাদের উপহার দিলেন এই মন্ডার নাম মুক্তাগাছার মন্ডা হলেও এই মন্ডা সেই মন্ডা যা রাজ পরিবারের জন্য বিশেষ ভাবে তৈরী হতো যখন রাজা বাহাদুররা মুক্তাগাছায় রাজত্ব করতেন। তিনি আরও জানালেন রাজা বাহাদুর ভারতে যাবার সময় রাজ পরিবারের জন্য যে ময়রারা মন্ডা তৈরী করতো তাদেরও সাথে করে ভারতে নিয়ে যান। বাংলাদেশে আসবার সময় তিনি কয়েকজন ময়রাকে সাথে এনেছেন বিশেষ ভাবে তৈরী মন্ডা তাঁর ভোজনের জন্য প্রতিদিন প্রস্তুত করতে। রাজার জন্য তৈরী বিশেষ মন্ডা থেকে আমাদেরকে উপহার হিসাবে ১ কেজি মন্ডা দেওয়া হয়েছে।

ණ☛ রাজার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বিদায় নিয়ে ময়মনসিংহ সেনানীবাসে ফিরে মন্ডার প্যাকেট খুলে মন্ডার সাইজ, রং এবং গন্ধে আমরা বিমোহিত হলাম। এমন মন্ডা মুক্তাগাছায় হয়না। এ এক আলাদা মন্ডা। হাতির দাঁতেরই মতো ঝকঝকে সাদা রং স্বাদে অতুলনীয়। মন্ডা খাবার পরে মনে হলো সমস্ত বুক যেন শীতল হয়ে গেলো। শেষে বলবো আমি মুক্তাগাছার মন্ডা খেয়েছি যা ছিল রাজকীয় স্বাদে গন্ধে মোহনীয়।

লেখক: কলামিস্ট ও প্রাক্তন মহাপরিচালক বিডিআর।

লেখাটি ৪৩৭ বার পড়া হয়েছে
নিউজ অর্গান টোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


Share


Related Articles

Comments

ফেসবুক/টুইটার থেকে সরাসরি প্রকাশিত মন্তব্য পাঠকের নিজস্ব ও ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোট ভিসিটর সংখ্যা
৫৯১০৮৮১৪

অনলাইন ভোট

image
জনগণের নয়, বিচারকদের প্রজাতন্ত্রে বাস করছি, সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের এ বক্তব্যের সাথে আপনি কি একমত?

আপনার মতামত
হ্যাঁ
না
ভোট দিয়েছেন ৬২৭ জন

আজকের উক্তি

আট বছরে আট মিনিটের জন্যও রাজপথে উত্তাপ না ছড়ানোর ব্যর্থতায় বিএনপির টপ-টু-বটম নেতাদের পদত্যাগ করা উচিত: ওবায়দুল কাদের