রাজনীতি

লালমনিরহাটে থামছে না বাল্যবিয়ে

image
Mon, January 1
04:24 2018

মোঃ ইউনুস আলী, লালমনিরহাট প্রতিনিধি:

ණ☛ দেশের প্রথম জেলা হিসেবে লালমনিরহাটকে বাল্যবিয়েমুক্ত জেলা ঘোষণা করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে জেলায় বহুগুণে বেড়েছে বাল্যবিয়ের প্রবণতা। কলেজে ওঠা তো দূরের কথা অষ্টম শ্রেণি পাস না করতেই স্বামীর সংসারে যেতে বাধ্য হচ্ছে এ অঞ্চলের কিশোরী মেয়েরা। এ কাজে ছাত্রীর পরিবারের চেয়ে ঘটক ও নিকাহ রেজিস্ট্রাররা বেশি আগ্রহী বলে দাবি স্থানীয়দের। এর আগে বাল্যবিয়ের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে অনেকের জেল-জরিমানাও হয়েছে। কারাদন্ড থেকে বাঁচতে পারেননি নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজীরাও।

ණ☛ সাম্প্রতিক সময়ে বাল্যবিয়ে বন্ধে প্রশাসনের তেমন একটা হস্তক্ষেপ না থাকায় এবং জেলার নিকাহ রেস্টিারদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা জেলা রেজিস্টারের দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারীতার কারনে জেলায় বাল্যবিয়ের মতো সামাজিক ব্যাধির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না বলে স্থানীয়দের দাবি।

ණ☛ গত ২০১৬ সালে ২৪ জুন সদর উপজেলার গুড়িয়াদহ গ্রামের জান্নাতুল ফেরদৌসের মেয়ে জেসমিন নাহারের সাথে পাশের গ্রাম পশ্চিম গুড়িয়াদহের মোক্তার আলীর ছেলে আকবর আলীর সাথে বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন নিকাহ রেজিস্টার সমিতির সভাপতি আব্দুস সালাম। প্রায় বছর খানেক পরেই আকবর আলী ‘বনিবনা হচ্ছে না’র কারন দেখিয়ে জেসমিন নাহারকে তালাক দেয়। কিন্তু বিয়ের সময় যে জন্ম নিবন্ধনে জেসমিন নাহারের বয়স ১৮ দেখানো হয় তা ছিল ভূয়া। এ সংক্রান্ত কোন তথ্য সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে নেই বলে নিশ্চিত করেছেন গোকুন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সুশীল চন্দ্র।

ණ☛ এ ব্যাপারে নিকাহ রেজিস্টার আব্দুস সালাম বলেন, আমাকে যে জন্ম নিবন্ধন দেখানো হয়েছিল তাতে মেয়ের জন্ম তারিখ ছিল ১৯৯৮ সালের ২৮ মে। কিন্তু ‘জন্ম নিবন্ধনটি যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা কেন অনুসরন করেননি’ এমন প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে পারেননি।

ණ☛ ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীর বাল্যবিয়ে রেজিস্ট্রির প্রস্তুতি নেওয়ার অপরাধে দলগ্রাম ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজি আবু হানিফকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদ- প্রদান করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক তৎকালীন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম রাব্বী। সেই সঙ্গে ওই নিকাহ রেজিস্ট্রারের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশও করেন তিনি। রহস্যজনকভাবে সেই চিঠি আজ পর্যন্ত লাল ফিতায় বন্দি আছে জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে।

ණ☛ আবার কোন কোন নিকাহ রেজিস্টার গোপনে রাতের আঁধারে নকল ভলিউমে বর কনের নাম ঠিকানা লিখে বাল্যবিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে স্থানীয় সচেতন মহল বা প্রশাসন চেষ্টা করেও বাল্যবিয়ে থেকে রক্ষা করতে পারছে না স্কুল মাদরাসার শিক্ষার্থীদের। বাল্যবিয়ে মুক্ত এ জেলার অধিকাংশ ছাত্রীর শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটছে জেএসসি কিংবা পিএসসি পরীক্ষার পর পরেই।

ණ☛ সম্প্রতি আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর সরকারটারী আনন্দ স্কুলের নুরজাহান আক্তার নামের এক তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রীর সাথে পাশের গ্রামের চল্লিশ বছর বয়সী শফিকুল ইসলামের বিয়ে হয়। নিকাহ রেজিস্টার সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজী ফয়সাল আহমেদের বিসিক সংলগ্ন এলাকাস্থ বাড়িতে রাতের আধারে এ বিয়ে হয় বলে নুরজাহানের মা জানান। তিনি বলেন, একাধিক বিয়ের কথা গোপন করে শফিকুল নুরজাহানকে বিয়ে করার বিষয়টি ফাঁস হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বিয়ের কাবিন নামার সনদ নিতে কাজী ফয়সালের কাছে গেলেও তা না দিয়ে টালবাহানা করছে। বর্তমানে নুরজাহানের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন দরিদ্র এই পরিবারটি।

ණ☛ ফয়সাল আহমেদ এর মত জেলার চিহ্নিত কয়েকজন নিকাহ রেজিস্টারের বিরুদ্ধে একাধিক বাল্য বিয়ে রেজিস্ট্রি করার অভিযোগ থাকার পরেও তাঁদের কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না জেলা রেজিস্টার।

ණ☛ এমনকি ক্ষোদ এক নিকাহ রেজিস্টারের বিরুদ্ধে রয়েছে বাল্য বিয়ের অভিযোগ। আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্টার কাজী এজাজুল হক তাঁর প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়েই গত ১৫ অক্টোবর চাপারহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রীকে শাকিলা আক্তারকে বিয়ে করেন। এনিয়ে এজাজুলের প্রথম স্ত্রী মারুফা বেগম জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করলেও তাঁর বিরুদ্ধে আজ অবধি কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। মারুফা বেগমের অভিযোগ, সেই বাল্য বিয়ে ধামাচাঁপা দিতে এজাজুল হক বর্তমানে নানা কৌশল অবলম্বন করে চলেছেন।

ණ☛ আবার, ভূয়া লাইসেন্স থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পাটগ্রাম উপজেলার কুচলিবাড়ি ও জোংড়া ইউনিয়নের ভূয়া লাইসেন্সধারী নিকাহ রেজিস্টার কাজী রেজাউল ইসলাম ও আহসান হাবীব এর বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় মামলা করার নির্দেশ দিলেও তাঁদের বিরুদ্ধে আজও অজ্ঞাত কারনে কোন মামলা করা হয়নি।

ණ☛ অপরদিকে নানাভাবে মন্ত্রণালয়ের নাম ভাঙিয়ে বৈধ নিকাহ রেজিস্টারদের কাছ থেকে উৎকোচ আদায়ের চেষ্টারও অভিযোগ রয়েছে জেলা রেজিস্টার সরকার লুৎফুল কবিরের বিরুদ্ধে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর আইন মন্ত্রণালয় থেকে নিকাহ রেজিস্টারদের অডিটের নাম করে নিকাহ রেজিস্টার প্রতি মোটা অংকের চাঁদা তোলার নির্দেশ দেন জেলা রেজিস্টার সরকার লুঃফুল কবির। এ নিয়ে জেলা নিকাহ রেজিস্টারদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। পরে কাজী সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা (চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিকাহ রেজিস্টার) কাজী আব্দুল বারী তাঁর ফেসবুক পোস্টে মন্ত্রণালয় কর্তৃক ভূয়া অডিটের তথ্য ফাঁস করলে পরদিন তা বাতিল করতে বাধ্য হন জেলা রেজিস্টার।

ණ☛ আবার জেলা রেজিস্টার মন্ত্রণালয়ের ভূয়া চিঠি তৈরী করে আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্টার মামহমুদুল হাসানকে হেনস্তা করতে নয় বছর পূর্বে তাঁর মৃত বাবা সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে কাল্পনিক বাল্য বিয়ের অভিযোগে লাইসেন্স বাতিলের চিঠি পাঠান। যাতে করে মাহমুদুল হাসান পৈতৃক সুত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া নিকাহ রেজিস্টারের লাইসেন্স আপনাআপনি বাতিল হয়ে যায়।

ණ☛ ওই নিকাহ রেজিস্টার মাহমুদুল হাসান এ ব্যাপারে জানান, নিয়মিত মাসোহারা না পেয়ে দীর্ঘ নয় বছর পূর্বে তাঁর বাবা মারা গেলেও মৃত বাবার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন বাল্য বিয়ের অভিযোগে লাইসেন্স বাতিলের চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে কোন্ সুনির্দিষ্ট বাল্য বিয়ের অভিযোগে এ নির্দেশ তা আজও কাউকে জানাতে পারেনি জেলা রেজিস্টার। এ নিয়ে মাহমুদুল হাসান নিম্ন আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন এবং উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছেন যার শুনানিতে উচ্চ আদালত তাঁকে ওই ইউনিয়নে বিযে রেজিস্ট্রি চালিয়ে যাওয়ার আদেশ দেন।

ණ☛ জেলার সচেতন মহলের দাবী গত প্রায় দুই বছর আগে ২০১৫ সালের ২৭ নভেম্বর লালমনিরহাটকে দেশের প্রথম বাল্যবিয়ে মুক্ত জেলা ঘোষণা করা হলেও জেলা রেজিস্ট্রারের মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতরটিতে জালিয়াতির ঘটনা ঘটার ফলে জেলা বাল্য বিয়ে রোধ করা যাচ্ছে না।

ණ☛ জেলা আইনজীবি সমিতির সদস্য এ্যাডভোকেট আবু আহাদ খন্দকার লেলিন বলেন, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্রতা আর অসচেতনতার কারনে বাল্য বিয়ে থামানো যাচ্ছে না। সেই সুযোগে কিছু দুর্নীতিবাজ কিছু নিকাহ রেজিস্টারের সহযোগিতায় অভিভাবকরা তাঁদের কন্যাদের বাল্যবিয়ে দিচ্ছেন যা নারী শিক্ষার জন্য মারাত্বক হুমকি স্বরুপ। সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এ সমস্যার আশু প্রয়োজন।”

ණ☛ এ ব্যাপারে জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক ক্যাপ্টেন (অব:)আজিজুল হক বীর প্রতীক দরিদ্র অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবকে দায়ী করে বলেন, মূলত নিকাহ রেজিস্টাররাই বাল্যবিয়ের প্রবণতা কমাতে পারে তবে তাঁদের বেশী বেশী করে প্রশিক্ষন এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব।

জেলা রেজিস্টার সরকার লুৎফুল কবির তাঁর বিরুদ্ধে সকল অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি মন্ত্রণালয়ের বিধি এবং নির্দেশ মেনেই সব করেছি।

ණ☛ এ ব্যাপারে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ বলেন, আমরা প্রতি নিয়তই বাল্য বিয়ের খবর পাচ্ছি তবে জেলা প্রশাসন সতর্ক আছে। বাল্য বিয়ের মতো সামাজিক সমস্যা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে এবার বাল্যবিয়ে রেজিস্ট্রি করা কাজিদের নামে মামলা করা হবে।

লেখাটি ১৭২ বার পড়া হয়েছে
নিউজ অর্গান টোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


Share


Related Articles

Comments

ফেসবুক/টুইটার থেকে সরাসরি প্রকাশিত মন্তব্য পাঠকের নিজস্ব ও ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোট ভিসিটর সংখ্যা
৭৪৮৪২৬০৯

অনলাইন ভোট

image
মাদক বিরোধী অভিযানের নামে অব্যাহত ক্রসফায়ার সমর্থন করেন কি?

আপনার মতামত
হ্যাঁ
না
ভোট দিয়েছেন ৭৮ জন

আজকের উক্তি

নির্বাচনকালীন সরকার কিংবা সহায়ক সরকার বিষয়টি রাজনৈতিক, এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই: প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা