রাজনীতি

তরুণ-তরুণীদের হলি খেলা এবং কিছু কথা

image
Sat, March 3
02:09 2018

ইখতিয়ার উদ্দীন আজাদ:

সনাতন ধর্মীয় উৎসব 'হোলি সার্বজনীন’ প্রচার করে উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের এই রঙ মেখে সঙ সেজে’ ঘুরে বেড়ানো কী বার্তা দেয়?

হোলি উৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজস্ব ধর্মীয় উৎসব। ধর্মীয় উৎসব সার্বজনীন হয় কেমন করে? সার্বজনীন এবং সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে মুসলিম ধর্মাবলম্বী তরুণ-তরুণীদের মগজ ধোলাই করে হোলি খেলায় মেতে উঠতে উদ্বুদ্ধ করার রহস্য কি? ধর্মীয় উৎসব আর সংস্কৃতি উৎসব কী এক জিনিস? উৎসবের নামে রাস্তাঘাটে জোর করে মানুষের মুখে রঙ মাখানো, তরুণীদের শরীরে হাত দেয়া কি নৈতিকতার সঙ্গে যায়? রঙ খেলার নামে প্রকাশ্যে কিছু তরুণ- তরুণীদের বেলেল্লাপনা ধর্মীয় অনুশাসন তো নয়ই; দেশের প্রচলিত আইন কি সমর্থন করে?

১৩ মার্চ রাতে যমুনা টিভির খবর যারা দেখেছেন তাদের কারো চোখ এড়ায়নি দৃশ্যটি। ২৮-৩০ বছর বয়সী এক মহিলা পুরান ঢাকার রাস্তায় অসহায় হয়ে কাঁদছেন, ‘আমাকে মাফ করে দেন; আমি চাকরি করি।

রঙ দিলে আমি অফিসে যেতে পারব না; নতুন চাকরি পেয়েছি সময়মতো না গেলে চাকরি থাকবে না। চাকরিই আমার সংসারের অবলম্বন’। মধ্যবয়সী মহিলার আর্তচিৎকারের খবর টিভিতে দেখে দর্শকদের মন কাঁদলেও ‘রঙ মাখানো’ হোলি উৎসবকারীদের মন গলেনি। তারা মহিলার মুখে ও কাপড়ে রঙ মাখিয়ে দেন।

একই সচিত্র খবরে দেখা যায় কিছু যুবতী একে অন্যকে রাঙিয়ে উচ্ছ্বাস করছেন; কিছু তরুণ-তরুণী একাকার হয়ে রঙ মাখছেন; কিছু তরুণ রঙে রাঙানো তরুণীদের কামিছ ধরে টানাটানি করছেন; ওড়না ফেলে দিচ্ছেন। রঙ মাখানোর মত্ততায় তরুণীদের বুকে হাত চালিয়ে দিচ্ছে তরুণরা। যমুনা টিভির এই খবর রাজধানী ঢাকার হোলি উৎসবের একটি খ-চিত্র উঠে এসেছে।

তাহলে প্রকৃত চিত্র কত ভয়ঙ্কর হতে পারে কল্পনা করুণ? তাহলে কি উৎসবের নামে রাজপথে উঠতি বয়সী তরুণ- তরুণীদের রঙ মেখে যা ইচ্ছে তাই করো; নোংরামিতে নেই মানা? ওই খবরে কিছু তরুণ-তরুণীর বক্তব্য প্রচার করা হয়। তারা দারুণ খুশি। কেউ বলছেন, উৎসবে অংশ নিতে পেরে জীবন ধন্য, কেউ বলছেন, দারুণ খুশি, কেউ বলছেন, ছেলে-বুড়ো সবাই রঙ খেলছি এটা দারুণ মজা; আবার কেউ রাস্তায় পথচারীদের ধরে জোর করে রঙ লাগিয়ে দেয়াকে অতি বাড়াবাড়ি মন্তব্য করছেন।

তবে পুরান ঢাকার এক মন্দিরের পাশে অবির খেলারত এক তরুণী অভিযোগ করলেন, রঙ খেলা উৎসবের সুযোগ নিয়ে কিছু বখাটে মেয়েদের শরীরে হাত দিয়ে অসভ্য আচরণ করছে। এক বয়ষ্ক মহিলা বললেন, রঙ খেলার উৎসবের সুযোগ নিয়ে কিছু বিকৃত রুচির বখাটে যুবক মেয়েদের সঙ্গে অসভ্যতা করছে। রঙ দেখার নামে তরুণীদের গাল টিপছে।

টিভিতে প্রচারিত পুরান ঢাকার রঙ মাখানোর উৎসবের সচিত্র খবরে আরো অনেক দৃশ্য দেখানো হয়; যা দৃষ্টিকটু। দেড় যুগ আগে এক থার্টি ফাস্ট নাইটে এই ঢাকার শহরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ‘এক বাঁধনের বস্ত্রহরণের ঘটনা’ গোটা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

মধ্যরাতে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনা নিয়ে বই পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়। ধিকৃত বাধনের কাহিনী জানতে আওয়ামী লীগ নেতা ফেনির জয়নাল হাজারীর লেখা সেই বই হাজার হাজার কপি বিক্রি হয় বাংলা একাডেমির বইমেলায়। অথচ এখন হাজার হাজার বাঁধন রাতের আধারে নয়, দিনে দুপুরে হোলি খেলার নামে উঠতি বয়সী তরুণদের সঙ্গে বেলেল্লাপনার দৃশ্যের জন্ম দিচ্ছে! কলেজ থেকে ফিরছিল ছেলে। বাসার গেইটে পৌঁছাতেই কলেজপড়–য়া দুই তরুণী রিকশা থেকে ঝাপ দিয়ে নেমে ‘দোস্ত যাবি কোথায়’ বলেই মুখে রঙ মেখে দেন।

তরুণীদ্বয় রঙ মাখিয়ে ‘গুডবাই দোস্ত’ বলে রিকশায় উঠে চলে যায়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় ছেলে লজ্জা-ভয়ে-অপমানে চারদিকে তাকিয়ে দেখেন বাড়ির দারোয়ান বা অন্য কেউ দেখলো কিনা। কল্পনা করা যায়! হোলি উৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব। তারা সেটা পালন করুক।

সংস্কৃতির আগ্রাসনে ডুবে যাওয়া আমাদের দেশের বরেণ্য ব্যাক্তিত্ব, সংস্কৃতি সেবীরা হোলির নদীতে ডুব দিক- সাঁতার কাটুক। এটা তাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা। কিন্তু সাধারণ মানুষকে বাধ্য করা হবে কেন? দু’দিন রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তায় দেখা গেল হোলি উৎসবের নামে রাস্তায় অফিসগামী মানুষকে রিকশা থেকে নামিয়ে জোর করে রাঙিয়ে দেয়া হচ্ছে। অফিসগামী মানুষ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছেন।

অনেকেই বাসায় ফিরে গেছেন। আবার যাাদের সে উপায় নেই তারা মুখের রঙ তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করে অফিসে হাজির হয়েছেন। রাস্তায় চলাচলরত মানুষের মুখে জোর করে রঙ লাগিয়ে দেয়া উৎসব? অনেকেই আপত্তি করছেন; অনুনয়-বিনয় করছেন রঙের হাত থেকে বাঁচতে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? জোর করেই রঙ লাগানো হচ্ছে। গণতান্ত্রিক দেশে হরতাল করার অধিকার রয়েছে; হরতাল কাজে যাওয়ারও অধিকার মানুষের রয়েছে। হরতালের সময় রাস্তায় গাড়ি নামানো মানুষকে ঘরে ফিরে যেতে বাধ্য করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলে হোলি উৎসবে জোর করে রঙ দেয়া কি অপরাধের মধ্যে পড়ে না? ধর্মীয় দিক দিয়ে হোলি খেলার অধিকার রয়েছে; আবার রঙ না মাখারও অধিকার রয়েছে। কিন্তু ৯২ ভাগ মুসলমানের দেশে জোর করে হোলি উৎসবে সামিল হতে বাধ্য করা কেন? বিজ্ঞানের সাফল্য ও মুক্ত আকাশ সংস্কৃতি মানুষের জীবন ধারায় এনে দিয়েছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

এই পরিবর্তন সব ক্ষেত্রে সুফল বয়ে এনেছে নাকি কুফল সেটা গবেষণার বিষয়। মুক্ত আকাশ সংস্কৃতিকে আমরা কিভাবে গ্রহণ করছি বা এই সংস্কৃতিকে সঠিকভবে উপভোগ-ব্যবহার করতে পারছি কি না সেটাই প্রশ্ন। মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির নামে আমরা কলকাতার হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতির সাগরে ক্রমান্বয়ে ডুবে যাচ্ছি। সংস্কৃতির আগ্রাসন দেশের মুসলিম ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন, মূল্যবোধ যেন ধ্বংস করে দিচ্ছে।

মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়ে নিজের ধর্ম পালনে আগ্রহ নেই; অথচ অন্য ধর্মের প্রতি মমত্ববোধে অস্থির! তাহলে কি আমরা আকাশ সংস্কৃতির নামে নিজস্ব কৃষ্টি ভুলে প্রগতিশীলতার নামে অপসংস্কৃতির চর্চায় ভুল সাগরে ডুবে মরছি?

নদীমার্তৃক এই বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য। শত শত বছর ধরে লালিত এই সংস্কৃতি আমাদের অতীত ঐতিহ্যকে বর্তমানের কাছে তুলে ধরছে। বিশ্বের বড় বড় শহরে সেটা ধ্বনিত হচ্ছে। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ব্রক্ষপুত্র-তিস্তার প্রবাহমান ধারার মতোই সংস্কতির ধারা এগিয়ে চলছে দেশ থেকে দেশান্তরে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
পত্নীতলা, নওগাঁ।

লেখাটি ১২৯ বার পড়া হয়েছে
নিউজ অর্গান টোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


Share


Related Articles

Comments

ফেসবুক/টুইটার থেকে সরাসরি প্রকাশিত মন্তব্য পাঠকের নিজস্ব ও ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোট ভিসিটর সংখ্যা
৭১৬৭৫৩৫৪

অনলাইন ভোট

image
ধর্ষণ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় আপনি কি মনে করেন ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত?

আপনার মতামত
হ্যাঁ
না
ভোট দিয়েছেন ৬৭ জন

আজকের উক্তি

নির্বাচনকালীন সরকার কিংবা সহায়ক সরকার বিষয়টি রাজনৈতিক, এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই: প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা