রাজনীতি

আমি এক অষ্টরম্ভা বলছি......

image
Tue, March 13
09:22 2018

মামুন উদ্দিন।।

আমি এক অষ্টরম্ভা। গুণে গুণে জীবনের ৩০টি বছর পার হয়ে গেল না-বলা, না-দেখা, না-পাওয়ার আর্তি নিয়ে। অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে স্কুল, এরপর কলেজ জীবন পার করেছি, সেই কবে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ হলো আরো বড় স্বপ্ন নিয়ে। আবদুল্লাহ আবু সাইদ বলেন, মানুষ স্বপ্নের সমান বড়। অনেকে বলেন, স্বপ্নের চেয়েও মানুষ বড়।

বলছিলাম আমার কথা। আমার খসে যাওয়া সময়ের কথা। জীবনের মধ্য গগনে এসে তাই মনে হল একটু হিসেব কষি। এ বয়সে কতজন কতকিছুই না করে ফেলেছেন। হয়েছেন ভুবন বিখ্যাত। পড়ালেখা করে অথবা না করেও কতজন পাঠ্য হয়েছেন আমার, আমাদের। উচ্চতর গবেষণার বিষয়বস্তু হয়েছেন। আর আমি? আমি কে? বলছিলাম আমি, আমি মধ্য বয়সের এক অষ্টরম্ভা।

ইংরেজ রোমান্টিক কবি জন কীটস। মারা গেছেন মাত্র ২৫ বছর বয়সে। জগতের সব সুন্দরের মাঝে আমরা এখনো তাকে খুঁজে পাই। খুঁজে পাই তার বাণীর মধ্যে। ‘A thing of beauty is a joy forever.’ কিংবা ‘Beauty is truth, truth beauty,’। আমি যদি পারতাম! এখনো পারিনি। এখন আমার বয়স ৩১ বছর চলে।

প্রভাবশালী আরেক ইংরেজ রোমান্টিক কবি পার্সি বিসি শেলি। মারা যান ২৯ বছর বয়সে। অথচ এর মধ্যে কত কিছুই না করে গেলেন! আর আমার বয়স ৩০ বছর পার হয়ে গেল। আমি যদি তার মতো করে বলতে পারতাম, ‘O, wind, if winter comes, can spring be far behind?’ কিংবা ‘Our sweetest songs are those that tell of saddest thought.’ আর হবে কই? আমি যে এখন মধ্য গগনে।

‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ-পিঠে চলে যেতে হবে আমাদের। চলে যাব— তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি—নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গিকার।’

বলছিলাম বাংলার কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথা। মাত্র ২১ বছর বেঁচেছেন। এর মধ্যেই অতীতের আর অনাগতকালের শত-সহস্র তরুণ প্রাণে প্রতিবাদ, দ্রোহ, বিদ্রোহের চেতনা ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। আর আমার বয়স ৩১ বছর চলে। ধার করা বিদ্যায় এখনো চালিয়ে নিতে হচ্ছে। এ আমার অক্ষমতা, এ আমার অযোগ্যতা। আমারও তো সবই ছিল, আছে। তাই তো আমি এক মধ্য বয়সের অষ্টরম্ভা।

‘ইংরেজি সাহিত্যে শেকসপিয়রের পরেই সবচেয়ে প্রতিভাবান কবি ও নাট্যকার হিসাবে ক্রিস্টোফার মার্লো স্বীকৃত। ইলিজাবেথিয়ান যুগের এই কবি ও নাট্যকার ২৯ বছরে নিহত হন আততায়ীর হাতে। কিন্তু তার লেখা ‘তৈমুর লঙ’, ‘ডক্টর ফস্টাস’ নাটক আজও বিশ্বের প্রতিটি দেশে পাঠ্য। আরেক ইংরেজ কবি টমাস চেটার্টন মারা গেছেন ১৭ বছর বয়সে। অসাধারণ প্রতিভাধর মার্কিন মহিলা কবি সিলভিয়া প্লাথ মাত্র ২১ বছর বয়সে আত্মহনন করেছিলেন। কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন ‘এরিয়েল’-এর মতো অসামান্য কাব্যগ্রন্থের জন্য।’

আমি তো বিদ্যা অর্জন করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। আর হাসন রাজা! তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই ছিল না। ১৫ বছর বয়সে বাবা মারা গেল সংসার ও জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত হয়। সেই তিনিই আবার সহজ-সরল সুরে আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় এক হাজার আধ্যাত্মিক গান রচনা করেন। মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়া, হাছন রাজায় কয়, একদিন তোর হইবো রে মরণ, লোকে বলে বলেরে, নিশা লাগিলো রে- এরকম অসং শ্রোতাপ্রিয়া গানের গাতিকার, সুরকার, শিল্পী হাসন রাজা। আমি কি পেরেছি এরকম একটা গানের কথা রচনা করতে? তাই তো আমি মধ্য বয়সের এক…।

বাংলা বাউলগানের এক কিংবদন্তি শিল্পী শাহ আবদুল করিম। একাডেমিক পড়াশোনার ধারেকাছেও ছিলেন না। তবে তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। সেই তাকে নিয়েই এখন কতো গবেষণা হচ্ছে! অসংখ্য বই লেখা হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হতে থাকবে। স্বশিক্ষিত আব্দুল করিম প্রায় পাঁচ শতাধিক গান লিখেছেন এবং সুরারোপ করেছেন। বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, গাড়ি চলে না, রঙ এর দুনিয়া তরে চায় না, ঝিলঝিল ঝিলঝিল করেরে ময়ুরপংখী নাও, আমি কূলহারা কলঙ্কিনী, কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া, কোন মেস্তরি নাও বানাইছে কিংবা কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু।

স্রষ্টা তার মতোই আমাকেও সবকিছু দিতে একটুও কার্পণ্য করেননি। দুটি হাত, দুটি পা, দুটি চোখ, মস্তিষ্ক ভরা মগজ, সব। আবুল হাসানের কবিতা ‘রাজা যায় রাজা আসে’র মতো আমারও দিন যায় দিন আসে। অথচ রসুল সা. বলেছেন, ধ্বংস তার জন্য, যার আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে উত্তম হলো না। তাই এ বয়সে আমি নিজেকে উল্লিখিত অভিধানে আখ্যায়িত করা ছাড়া আর কিইবা করতে পারি?

আমার কাছে বিস্ময়ের মহাবিস্ময় বিদ্রোহী কবি, এ দেশের জাতীয় কবি, তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং আধুনিক বাংলা গানের জগতে ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত। পড়ালেখার গণ্ডি নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া পর্যন্ত। নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘খোদা হাত দিয়েছেন বেহেস্ত ও বেহেস্তি চিজ অর্জন করার জন্যে, ভিখারির মত হাত তুলিয়া ভিক্ষা করার জন্য নয়। আমরা আমাদের পৃথিবী মনের মত করিয়া গড়িয়া লইব, আর এটাই হউক তরুণের সাধনা।’ খোদা আমাকে সবকিছু দেয়ার পরেও আমি তো পারিনি। পারিনি ঋষিতুল্য একটি বাণী, অনিন্দসুন্দর একটি কবিতার পঙক্তি, যৌবনের গানের মতো একটি প্রবন্ধ রচনা করতে। হে স্রষ্টা, কী জবাব দেব আমি তোমার কাছে?

তবে আমি স্বপ্ন এখনো দেখি। মহামহিম ফেরেশতা প্রাণবায়ু কেড়ে নেয়ার আগ পর্যন্ত স্বপ্ন দেখতে চাই। তবে এখন আমার ভাবনায় ভিন্নতা এসেছে। এসেছে স্বপ্ন দেখাতেও। আগে স্বপ্ন দেখতাম অনেক বড় হওয়ার, সফল হওয়ার। আর এখন দেখি সার্থক হওয়ার। সফল হতে পারিনি, সার্থক হতে দোষ কোথায়? আল্লামা শেখ সাদী র. বলেছেন, “এতদিন আমি বোকা ছিলাম তাই পৃথিবীকে বদলানোর চেষ্টা করতাম। আজ আমি চালাক হয়েছি, তাই নিজেকেই বদলিয়ে ফেললাম”। দৃষ্টির গোচরে-অগোচরে মহান অধিপতি সবকিছুই দেখছেন। চূড়ান্ত বিচারে যদি সার্থক হতে পারি সেটাইতো সর্বশ্রেষ্ঠ সফলতা।

মো. মামুন উদ্দীন,

শিক্ষক মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

লেখাটি ২১১ বার পড়া হয়েছে
নিউজ অর্গান টোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


Share


Related Articles

Comments

ফেসবুক/টুইটার থেকে সরাসরি প্রকাশিত মন্তব্য পাঠকের নিজস্ব ও ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোট ভিসিটর সংখ্যা
৭৮৭১১৬৩৪

অনলাইন ভোট

image
মাদক বিরোধী অভিযানের নামে অব্যাহত ক্রসফায়ার সমর্থন করেন কি?

আপনার মতামত
হ্যাঁ
না
ভোট দিয়েছেন ১১২ জন

আজকের উক্তি

নির্বাচনকালীন সরকার কিংবা সহায়ক সরকার বিষয়টি রাজনৈতিক, এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই: প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা
Changer.com - Instant Exchanger