রাজনীতি

দারুল উলুম দেওবন্দ ও বাংলাদেশের আলেম সমাজ

image
Thu, April 5
12:36 2018

গোলজার আহমদ হেলাল:

বছর দু'য়েক আগে সিলেট শহরের একটি স্বনামধন্য মাদ্রাসার ওয়াজ মাহফিল কিছুক্ষণ উপভোগ করার সুযোগ হয়েছিল। মাদ্রাসাটি কওমী ঘরানার। সেখানে একজন বরেণ্য আলেমের বক্তৃতা আমাকে আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি কিছুটা রেখাপাতও করছিল। বক্তা বক্তৃতা বেশ ভালোই করছিলেন। শুনতেও খুব ভালো লাগল। কিন্তু দু'/একটি কথা তিনি দাম্ভিকতার সুরে বললেন, যা আমার পছন্দ হয়নি। তবে যে কথা পছন্দ হয়নি সে কথা তিনি কেন বললেন এর একটি জের আছে, ঈধঁংব ঙভ ধপঃরড়হ আছে।

আমাদের সমাজে কিছু লোক আছে যারা দারুল উলম দেওবন্দ বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের পৈত্রিক সম্পত্তি মনে করেন। আবার কিছু লোক আছে যারা ঐ প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে চরম নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। ঐ জায়গা থেকে পাশ করা লোকদেরকে হীনমন্যতার চোখে দেখেন। মূলতো এরা উভয় ধরনের লোকই কিছুটা বাড়াবাড়ি করছেন যা শোভনীয় নয়।
ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানদের অবদান ও আলেমসমাজের নেতৃত্বদান ছিল ঐতিহাসিকভাবে সুপ্রতিষ্টিত এক সত্য ঘটনা। ৮ম শতাব্দীর শুরুতে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পর থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত উপমহাদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেসময় এখানে মুসলিম শাসন ক্ষমতার বন্ধ্যাত্ব, শাসকদের অযোগ্যতা ও দূর্বলতাকে লক্ষ্য করেই বণিক হিসাবে আগত ইংরেজরা এদেশের শাসক হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এদেশীয় ধনাঢ্য লোভী ও বিশ্বাসঘাতদের যোগসাজসে ১৭৫৭ সালে বাংলা বিহারের স্বাধীনতা বিদেশী ইংরেজদের কাছে বিক্রি করে দিয়ে এ উপমহাদেশে বৃটিশ শাসনের ভিত রচনা করা হয়।

পলাশী যুদ্ধে ইংরেজদের হাতে মুসলমানদের বিপর্যয়ের পর একের এক স্বাধীন রাজ্য গুলোকে বশ্যতা স্বীকারে তারা বাধ্য করল। ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীর চিন্তায় উদ্ধুদ্ধ এবং ইংরেজ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধে নিবেদিত প্রাণ মহিশুরের বীর টিপু সুলতানকে ইংরেজরা পরাজিত ও হত্যা করল। সর্বশেষ সম্রাট শাহ আলমকে জায়গীর হিসাবে লালকেল্লা ছেড়ে দিয়ে ১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লী হস্তগত করে। সমগ্র ভারতে ইংরেজরা নিরংকুশ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করল। তারা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে দৃঢ়তর করার জন্য বস্তুবাদী শিক্ষা সংস্কৃতির প্রসার করে মুসলমানদের কে হীনমনা জাতি হিসাবে গড়ে তোলার গভীর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে লাগল। ঠিক ঐ সময়েই মাও. শাহ আব্দুল আজিজ দেহলভী এক বিপ্লবী ফতোয়া প্রচার করেন।

ভারতকে দারুল 'হরব' শত্রুদেশ ঘোষণা করে হত্যোদ্যম জাতিকে পথের সন্ধান দেন। এবং ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনে দেশের জনগনকে জেহাদী প্রেরণার উদ্ধুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। শাহ আব্দুল আজিজ তার পিতা মহামনীষী ও ইসলামী রেনেসার উদগাতা হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ এর মৃত্যুর পর ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে দিল্লীর রহীমিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ওয়ালীউল্লাহ চিন্তাধারা প্রচারের মাধ্যমে ইসলামী পুনঃজাগরণের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। শাহ আব্দুল আজিজের এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সারা দেশের জনগণ ইংরেজ বিরোধী চেতনায় সংগঠিত হতে লাগল। স্থানে স্থানে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। শুরু হল অসহায় মুসলমানদের আজাদীর সংগ্রাম। আর সেই সংগ্রামের পুরো ভাগেই ছিলেন তৎকালীন মুসলিম সমাজের শিক্ষিত নেতৃবৃন্দ আলেম সমাজই। অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই এদেশের শাসকশ্রেণী মুসলমান বৃটিশরা তা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেনা। অপরদিকে হিন্দুগণ এটিকে বিধাতার আশির্বাদ হিসেবে গ্রহণ করে। যদিও পরবর্তীকালে তারাও স্বাধীনা আন্দোলনে যোগ দেয়। পাক ভারত বাংলা উপমহাদেশে খ্রিস্টীয় আঠারো শতকের প্রথম হতে বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ইংরেজ ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে মুসলমানরা যে সংগ্রাম করেছেন তা এদেশের ইসলামী মূল্যবোধের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার এক গৌরব উজ্জ্বল অধ্যায় ছিল।

ইতিহাসে এ অধ্যায়ে ইংরেজরা এদেশের আলেম সমাজের উপর অমানুষিক জুলুম নির্যাতন, বেপরোয়া ফাঁসি দান (প্রায় বিশ লক্ষ), আন্দামান দ্বীপ সহ বিভিন্ন দ্বীপে নির্বাসনকে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে অবিরাম আজাদীর সংগ্রাম করেছিলেন আলেম সমাজ, যা ইতিহাসে সোনার হরফে লেখা থাকবে।

এ উপমহাদেশে শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীর চিন্তাধারাকে কেন্দ্র করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কল্পে ইংরেজ ও শিখদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য তারই সুযোগ্য পুত্র শাহ আব্দুল আজিজ যে আন্দোলন তৈরি করেছিলেন তারই ফল সরূপ ১৮৩১ সালে বালাকোটের যুদ্ধ ও ১৮৫৭ সালের জাতীয় বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল। কিন্তু এক শ্রেণীর লোকের বিশ্বাসঘাতকতা, আধুনিক অস্ত্র- শস্ত্রের অভাব ও অনৈক্য ইত্যাদি কারণে মুসলিম আলেম সমাজের নেতৃত্বাধীন মুসলমানদের এ বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছিল। ১৮৫৭ সালের বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর গোটা উপমহাদেশে মুসলিম জীবনে ঘোর দুর্দিন নেমে আসে। হিন্দুরা ইংরেজদের চাটুকারিতায় লিপ্ত হল। ইংরেজগণ বিপ্লবের জন্য মুসলমানদের একক ভাবে দায়ী করল। তাদের উপর চালালো জুলুম নির্যাতনের ষ্টীম রোলার। বিপ্লবের নায়ক আলেমগণকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয় , দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়। কাউকে কারাগারের অন্ধকার কক্ষে নিক্ষেপ করা হয়।

মুসলমানদের সামগ্রিক জীবন হয়ে উঠে সংকীর্ণ ও দুর্বিসহ। যাবতীয় অধিকার থেকে করা হয় বঞ্চিত।
প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আলেম সমাজ সংগ্রামের পথ ছেড়ে দেননি। তারা ইংরেজদের চক্ষু এড়িয়ে শিক্ষা- সংস্কৃতি চর্চা ও জেহাদের অনুকূলে কাজ চালিয়ে যেতেন। স্থানে স্থানে মাদ্রাসা কায়েম ও ধর্মীয় সভা সমিতির মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষা -সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখার কাজ করতেন। সেই সঙ্গে ইসলামী জাগরণকে উপমহাদেশে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালান। বস্তুত সে চেষ্টা ও পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই আমরা বিশ্ব বিখ্যাত উচ্চ দ্বীনি শিক্ষা কেন্দ্র দারুল উলম দেওবন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানসমূহ দেখতে পাই। এগুলোকে কেন্দ্র করে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। এবং সেই সাথে ইসলামী পুনঃজাগরণের পথ উন্মুক্ত হয়। উত্তরকালে অসহযোগ আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলনকে উপলক্ষ্ করে মুসলমানদের মধ্যে আজাদী আন্দোলনের সাড়া জাগে এবং স্বাধীনতা লাভ করা পর্যন্ত সেসকল কাজে ঐ সকল প্রতিষ্ঠানের অপরিসীম অবদান রয়েছে। মূলতো ১৮৫৭ সালের গোলযোগের পর মক্কায় অবস্থানরত স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান নেতা হাজী ইমদাদুল্লাহর নির্দেশে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতি লক্ষ রেখে আন্দোলনের গতিধারা আক্রমণ মূলক না করে প্রতিরক্ষা মূলক করার দিকে তার সহকর্মী শিষ্য নেতৃবৃন্দ মনোযোগী হন। এ উদ্দেশ্যে ওয়ালীউল্লাহ আন্দোলনের কর্ম পরিষদ দিল্লীস্থ রহিমিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নমুনায় দিল্লীর বাইরে একটি ইসলামী শিক্ষা ও প্রচার কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রখ্যাত আলেম মাওলানা কাসেম নানতুবী অন্যান্য সহকর্মীদের নিয়ে এ উদ্দেশ্যে স্থান ও প্রয়োজনীয় বিষয় সমূহ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতে থাকেন। অবশেষে দিল্লীর পতনের নয় বছর পর ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁরই প্রচেষ্টায় প্রস্তাবিত ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলম দেওবন্দ বিশ্ববিদ্যালয়। এর ছয় মাস পর ছাহরান পুরে এর আরেকটি শাখা উদ্বোধন করা হয়। এমনিভাবে অল্প দিনের মধ্যে এরকম প্রায় ৪০ টি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। উল্লেখ্য যে বালাকোটের আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর মাওলানা শাহ ইসহাক সাহেবের নেতৃত্বে উপমহাদেশে ইসলামী আন্দোলন পরিচালিত হয়। ১৮৫৭ সালে বিপ্লবের পূর্বে তিনি আন্দোলনকে গতিশীল করার লক্ষ্যে তার ভাই মাওলানা ইয়াকুবকে নিয়ে বিভিন্ন মুসলিম দেশ সফর করেন। ওই সময় মক্কা মদিনা তুর্কী খেলাফতের অধীনে ছিল। তিনি ভারতের মুসলমানদের ইংরেজদের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য তুরস্তের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এজন্য তিনি মক্কায় চলে যান এবং সেখান থেকেই আন্দোলনের পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এদিকে দিল্লীতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দানের লক্ষ্যে দিল্লী কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপাল মাওলানা মামলুকুল আলীর সভাপতিত্বে একটি কর্ম পরিষদ গঠিত হয়। উক্ত কমিটি বালাকোটের প্রেরণায় দুর্বার গতিতে কাজ করতে থাকে। পরবর্তীতে কমিটির নেতা হিসাবে হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজীরে মক্কী নির্বাচিত হন। এ কমিটির মূল কাজ ছিল শিক্ষা মূলক ও মুসলমানদের মাঝে আন্দোলনের সচেতনতা সৃষ্ঠি। শাহ ইসহাক দেওলভীর চিন্তা এবং এই কমিটির নেতৃবৃন্দের পরিকল্পনা অনুসারে আন্দোলনের বাস্তব কর্ম ক্ষেত্র হিসাবে দারুল উলম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য দারুল উলম দেওবন্দের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও এর অনুসারী পাক ভারতের কওমী মাদ্রাসা নামে যে সকল প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেখানে সেই আদর্শের চেতনা ও সে অনুযায়ী সমাজে নেতৃত্ব গড়ে তুলার উপযোগী কার্যক্রম আছে কিনা তা পর্যালোচনার বিষয়। অপ্রিয় হলেও সত্য বালাকোটের সেই প্রেরণা যদি উক্ত প্রতিষ্ঠান সমূহে কার্যকর থাকত এবং এদের শিক্ষা নীতি বাতিলের বিরুদ্ধে বুদ্ধি ভিত্তিক মোকাবেলায় যোগ্য আলেম তৈরি করতে সহায়ক হতো তাহলে সমাজের চিত্র আজ ভিন্নতর হতো। এ সকল মাদ্রাসা থেকে অসংখ্য উলামা প্রতিবছর বের হন অথচ সমাজ সে রকম মূল্যায়ন কিংবা গ্রহণ করছে না। এসকল শিক্ষা কেন্দ্র দারুল উলম দেওবন্দের মূল প্রেরণা থেকে বঞ্চিত, শিক্ষার্থীদের কাছে রয়েছে এর তথ্য অজানা।

যখন দারুল উলম দেওবন্দ ইসলামী আন্দোলনের প্রচার কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঠিক তার কয়েক বছর এর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা কাসেম নানতুভীর সহপাঠী স্যার সাইয়েদ আহমেদের প্রচেষ্টায় আরেক দৃষ্টি কোণ থেকে ১৮৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়। দেওবন্দের ভূমিকা যেখানে ছিল ইসলামী ভাব ধারার বিকাশ ও ইংরেজ উচ্ছেদের মাধ্যমে এদেশে ইসলামের মর্যাদা পুন:রায় প্রতিষ্ঠা করা। সেক্ষেত্রে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ইংরেজদের ভাষা শিক্ষা করে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে অংশ নিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও কাটা দিয়ে কাটা তুলার অভিপ্রায় মাত্র। অবশ্য সেখানে ইসলামী শিক্ষারও ব্যবস্থা ছিল। ফলে মাওলানা কাসেম নানতুভীর সঙ্গে স্যার সাইয়েদ আহমেদের মতের গড়মিল দেখা দেয়। সেই মতবিরোধই পরে দেওবন্দ/আলীগড় বিরোধিতায় রূপ নেয়। কিন্তু আলীগড়ের প্রতিষ্ঠাতা স্যার সাইয়েদ আহমদ মাদ্রাসা পাশ আলেম হলেও তিনি চিন্তা করেন নি , তার প্রতিষ্ঠানে মুসলিম স্বকীয়তা বোধের চেতনা আশানুরূপ বহাল থাকবে না। এভাবে একদিকে দারুল উলুম দেওবন্দ অপরদিকে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা সৃষ্টি করে যায়। মূলতো সে সময় থেকেই এ উপমহাদেশে মুসলমানদের মধ্যে বস্তুবাদী চিন্তা চেতনা সম্পন্ন এক শ্রেণীর শিক্ষিত লোকের সৃষ্টি হতে থাকে। অপরদিকে আলেম সমাজ আপোষহীন ভাবে তাদের সংগ্রামী ভূমিকার উপর অটল থাকেন। ইসলামী শিক্ষা সংস্কৃতির বিকাশে স্থানে স্থানে মসজিদ মাদ্রাসা গড়ে তুলার কাজ করেন।

বিষ্ময়কর বিষয় হলো মুসলমামদের এই দুঃসময়ে অনাহারে অর্ধাহারে থেকে কঠোর দারিদ্রের মধ্যে সম্মুখীন হয়েও আলেম সমাজ ইংরেজ সরকারের নিকট অর্থের জন্য হাত পাতেন নি কিংবা তাদের অর্থ ও আনুকল্য গ্রহণ করেননি। বরং তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। জাতির এই নিঃস্বার্থ সেবকরা ইংরেজ মানস সন্তানদের ভাষায় পরবর্তীতে 'মোল্লা' হিসাবে আখ্যায়িত হলেন আর তারা সাজলেন মিস্টার। আমাদের সমাজে এখনো ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, আলেমরা ইংরেজি শিখতে নিষেধ করে মুসলমানদের সর্বনাশ করেছেন। অথচ আসল ব্যাপার ছিল ইংরেজরা যখন শিক্ষার মাধ্যমে তাদের জীবনাচার ও জীবনদর্শনের গোলামে পরিণত করার হীন ষড়যন্ত্র করছিল তখন আতœমর্যাদা সম্পন্ন আলেম সমাজ এ সম্পর্কে নিজেদের স্বকীয়তা বজায়ে হুশিয়ারী করেছেন মাত্র। অথচ এ ঘটনায় ভিন্ন কালার দিয়ে আলেমদেরকে অভিযুক্ত করে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এ স্লো পয়জনটিই মুসলিম সমাজের অধঃপতনের মূল কারণ। অথচ স্যার সাইয়েদ আহমদ, সাইয়েদ আমীর আলী ও নবাব আব্দুল লতিফ মাদ্রাসা পাশ আলেম হয়েও ইংরেজী শিক্ষায় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। মূলত আলেমগণ লর্ড মেকলের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছিলেন, ইংরেজী ভাষার নয়। দেওবন্দ ও আলীগড় উভয় প্রতিষ্ঠানের কাজ পাশাপাশি চলতে থাকে। একটি ইংরেজদের প্রতি নমনীয় ভূমিকায় অপরটি তাদের রক্ত চক্ষুর কড়া পাহারায়। দারুল উলুম দেওবন্দকে ইংরেজরা নানাভাবে কোণঠাসা করতে লাগলো। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মাঝে টিকিয়ে থাকতে প্রতিষ্ঠানটি তার মূল উদ্দেশ্য ও স্বকীয়তা অনেকটাই হারিয়ে ফেলল। এক পর্যায়ে বালাকোট আন্দোলনের প্রেরণা, ওয়ালিউল্লার বৈপ্লবিক চিন্তাধারা তাদের মাঝে বিলীন হয়ে গেল। ফলে শিক্ষানীতির দিক থেকে সাধারণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পর্যায়ে নেমে আসলো।

উপমহাদেশের দ্বীনী শিক্ষার পাদপীট এ প্রতিষ্ঠান ও এর শাখা প্রশাখা সবগুলো ইসলামের আনুষ্ঠানিক এবাদতগাহে পরিণত হলো। এখানে ইকামতে দ্বীন ও খেলাফতে ইসলামীয়ার প্রভাব গৌন হয়ে গেল। ইসলামের আলকে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের প্রেরণা ও অনুভূতি শিক্ষানীতি থেকে হারিয়ে গেলো। এমনকি অনেক খ্যাতনামা আলেমের মাঝে যুগসমস্যা মোকাবেলায় ইসলামী রাষ্ট্রের রূপরেখার ধারণাই অনুপস্থিত ছিল। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা প্রয়োজন ইসলামী জ্ঞান গবেষণা ও সংস্কৃতি ভারতের বুকে অক্ষুণ্ণ রাখা ও তার প্রচার ও প্রসারে দারুল উলুম দেওবন্দের আরো এক কীর্তি হলো "নাদওয়াতুল মুসানেফীন" প্রতিষ্ঠানটি। ইহা বুদ্ধি ভিত্তিক সেবাকার্যক্রমে অনন্য ও অতুলনীয়। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পণ্ডিতগণের অধিকাংশই দেওবন্দের শিক্ষাপ্রাপ্ত ছিলেন। স্মরণ করা প্রয়োজন খেলাফত আন্দোলনের পর কংগ্রেসই ছিল আজাদী আন্দোলনে ভারতের হিন্দ মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।

এর মাধ্যমে অসহযোগ আন্দোলন পরিচালিত হয়। কিন্তু হিন্দুদের বিমাতাসুলভ আচরণের দারুণ ক্ষিপ্ত হয়ে মুসলিম নেতৃবৃন্দ ১৯০৬ সালে গঠিত মুসলমানদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান মুসলিম লীগে যোগদান করতে থাকেন। যদিও কিছুসংখ্যক নেতা তখনো কংগ্রেসে থেকে যান। বর্ণিত দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আজাদী সংগ্রামে লিপ্ত আলেমগণ শান্তির সুবাতাস পেলেন না। শাহ আব্দুল আজিজ দেহলভীর (১৮০৩ খ্রি:) ফতোয়া এখানে উপেক্ষিত হতে দেখা গেল। তাই অবিভক্ত ভারতের আলেমগণ মুসলমানদের ইসলামী নেতৃত্ব দানের লক্ষ্যে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে ২৮ ডিসেম্বর "জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ" নামক সর্ব ভারতীয় উলামা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। যুক্ত জাতীয়তা ও বিনা শর্তে কংগ্রেসকে সমর্থনের প্রশ্ন দেখা দেওয়ার আগ পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানের সাথে ভারতের প্রায় সকল শ্রেণীর আলেম জড়িত ছিলেন। এ বছরই জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ সর্বপ্রথম ভারত স্বাধীনতার দাবী তোলে। এর ১০ বছর পর ১৯২৯ সালে কংগ্রেস, ১৭ বছর পর ১৯৩৬ সালে মুসলিম লীগ স্বাধীনতার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম ঘোষণা এসেছিল ১৮০৩ খ্রিষ্টাব্দে শাহ আব্দুল আজীজের ফতোয়ার মাধ্যমে। ১৯৪৫ সালে দেওবন্দ আন্দোলনের কর্মীগণ ২ ভাগে বিভক্ত হন। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়লো। একদল দেওবন্দের সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা শিব্বির আহমদ ওসমানীর নেতৃত্বে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম আর অপর দল দেওবন্দের তৎকালীন অধ্যক্ষ মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানীর নেতৃত্বে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ নামে দুই পৃথক দলে পরিণত হয়। আর তখন থেকেই দেওবন্দ কংগ্রেসের রাজনৈতিক দর্শনের সমর্থক আলেমদের কেন্দ্রভূমি হয়ে দাড়াল।

এ কথা অনস্বীকার্য সত্য যে ভারতীয় মুসলমানদের কঠিনভাবে দমন নির্যাতন করার পরও কেন তারা বারবার জেগে উঠে। কোথায় এ শক্তির উৎস এ প্রশ্নের উত্তরে তৎকালীন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ব্রিটিশ কলোনিয়াল সেক্রেটারি গোল্ডস্টোন কে দায়িত্ব দিয়ে এখানে পাঠিয়েছিল ইংরেজ সরকার। দীর্ঘ জরিপ ও গবেষণা শেষে গোল্ডস্টোন পার্লামেন্টে যে প্রতিবেদন জমা দেন তার সারাংশে একটি মন্তব্য জুড়ে দেন। তার ভাষায়, "ঝড় ষড়হম ধং ঃযব সঁংষরস যধাব ঃযব ছঁৎধহ বি ংযধষষ নব ঁহধনষব ঃড় ফড়সরহধঃ ঃযবস. বি সঁংঃ বরঃযবৎ ঃধশব রঃ ভৎড়স ঃযবস ড়হ সড়ৎব ঃযবস ষড়ংং ঃযবরৎ ষড়াব ড়ভ রভ" অর্থাৎ "আমরা মুসলমানদের উপর বিজয়ী হতে পারব না যতদিন তাদের কাছে কুরআন থাকবে। আমাদেরকে হয় তাদের কাছ থেকে এটিকে কেড়ে নিতে হবে অথবা তাদের মন থেকে এর প্রতি ভালবাসা মুছে দিতে হবে।" আর ইসলামের প্রতি এ মমত্ববোধের চেতনা সৃষ্টি করেন আলেম সমাজ। অন্য কেউ নয়। দারুল উলুম দেওবন্দ বিশ্ববিদ্যালয় এ চেতনার অগ্রসসেনানী। শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীর চিন্তাধারার বিপ্লবী আলেমগণ শত শত দারুল উলুম প্রতিষ্ঠা করে যুগ যুগ থেকে এ চেতনাকে শানিত করছেন। ওয়াজ মাহফিলে মাওলানার বক্তব্যের মূল কথা ছিল, আমরা দেওবন্দী আলেমগণ পড়ালেখা শেষ করে পাড়ায় পাড়ায় মাদ্রাসা স্থাপন করি। আমরা চাকুরীর জন্য কারো কাছে হাত পাতি না। মাদ্রাসা পরিচালনার জন্য সরকারের কাছ থেকে কোনো অনুদানও নেই না। সরকারী সিলেবাসও অনুসরণ করিনা। আমরা আমাদের মতো প্রতিষ্ঠান চালাই এবং কার্যক্রম পরিচালনা করি। এর মাধ্যমে আমরা জীবিকাও নির্বাহ করি। সরকারী মাদ্রাসা পড়ুয়া আলেমগণ তো তা করতে পারেন না। মাওলানার বক্তব্য চমৎকার ও যুক্তিযুক্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো যে চেতনা নিয়ে দেওবন্দ জন্মলাভ করল সেই চেতনা আপনাদের মধ্যে অনুপস্থিত কেন? দেওবন্দের তৎকালীন শিক্ষানীতির আলোকে আপনার প্রতিষ্ঠান কি আপনারা সাজাতে পেরেছেন? দেওবন্দ কারো মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে তৈরী হয়নি।

তাহলে আপনার বক্তৃতায় বিভেদের সুর কেন? অপরদিকে যারা দেওবন্দী আলেমদের হেয় চোখে দেখেন তাদের জেনে রাখা ভাল, দেওবন্দ ব্যতীত এ উপমহাদেশের মুসলমানদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস বর্ণনা করা যাবে না। দেওবন্দ শুধু সু উচ্চ ইতিহাসের অংশ নয়, ইহা একটি পূর্ণাঙ্গ আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি। এতদঞ্চলের মানুষের আজাদী সংগ্রামের ঐতিহাসিক এক চারণভূমি।

(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।)

লেখাটি ৩৬২ বার পড়া হয়েছে
নিউজ অর্গান টোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


Share


Related Articles

Comments

ফেসবুক/টুইটার থেকে সরাসরি প্রকাশিত মন্তব্য পাঠকের নিজস্ব ও ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোট ভিসিটর সংখ্যা
৭১৬৭৫২২৯

অনলাইন ভোট

image
ধর্ষণ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় আপনি কি মনে করেন ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত?

আপনার মতামত
হ্যাঁ
না
ভোট দিয়েছেন ৬৭ জন

আজকের উক্তি

নির্বাচনকালীন সরকার কিংবা সহায়ক সরকার বিষয়টি রাজনৈতিক, এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই: প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা