আন্তর্জাতিক

ভারতের মারাত্মক আত্মকেন্দ্রিক নীতি ও প্রতিবেশী দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন

image
Sat, April 7
09:00 2018

নিউজ অর্গান টোয়েন্টিফোর.কম:

ভারতের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশগুলোতে বড় ধরনের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হচ্ছে। এর সবটাই ভারতের জন্য অশুভ। মালদ্বীপ, নেপাল, মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় স্থানীয়রা যেভাবে তাদের হৃদয়ের অনুভূতি প্রকাশের উপায় খুঁজে পেয়েছে, তা আগে কখনো দেখা যায় নি। এসব স্থানে নতুন এক ভূরাজনৈতিক খেলা চলছে। আর এতে ভারত কোনো খেলোয়াড় নয়। এ বিষয়ে দিল্লি কিছু বলতে অনাগ্রহী নাকি অপারগ? অনাগ্রহী, কারণ দেশপ্রেমের মতো নতুন নানা সংজ্ঞার মতো বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

অসমর্থ, কারণ, বিদ্যমান রাজনৈতিক চর্চা পররাষ্ট্রনীতিকে দুর্বল করে ফেলেছে যেখানে না আছে দূরদৃষ্টি, না আছে ভারিক্কি। এই পশ্চাৎপদতার নানা কারণের মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত. জওয়াহেরলাল নেহরুর সময়েও ভারতের যখন উপযুক্ত ও কার্যকর একটি পররাষ্ট্রনীতি ছিল, তখন নিজস্ব ভৌগোলিক বলয়ের ছোট ছোট দেশগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল ও সদয় দৃষ্টিভঙ্গি ছিল দিল্লি ও তাদের রাষ্ট্রদূতদের। এর ফলে শুরু থেকেই প্রতিবেশীরা ভারতকে অপছন্দ করা শুরু করে। দ্বিতীয়ত. বিজেপি ক্ষমতায় আসায় ভারতে মৌলিক ভাবধারায় পরিবর্তন এনেছে। এতে করে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সন্দেহ ঢুকেছে। তৃতীয়ত. বিগ ব্রাদার হিসেবে খেলছে চীন। ফেব্রুয়ারিতে মালদ্বীপে অভ্যন্তরীণ সংকটে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। তখন ভারতকে সহজেই, প্রকাশ্যে মালদ্বীপ সঙ্কটকে খাটো করে দেখেছে।

মালদ্বীপে ভারতের সরাসরি কোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা করবে এমন ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতিকে আরো বিব্রতকর করে তোলে চীন। আর সেই বড়ি নীরবে হজম করে ভারত। মালদ্বীপের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনের কাছে চীন দেশটির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদারদের মধ্যে অন্যতম। নেপালের বিষয়াদি যেভাবে ভারত মোকাবিলা করছে তা একের পর এক বিপর্যয়ের গল্প। নেপালে রাজতন্ত্রের জায়গায় গণতন্ত্র আসার পর অন্তত দিল্লির উপলব্ধি করা উচিত ছিল, এই প্রতিবেশী দেশটি অতীতের তুলনায় আরো বেশি মনোযোগ ও শ্রদ্ধা পাওয়ার দাবি রাখে।

বরঞ্চ, সেখানে ভূমিকম্পের পর যখন ত্রাণের জন্য মরিয়া মানুষ তখন তা দেয়া হলো শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের মনোভাব (সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্স) জড়িয়ে যা কাঠমান্ডুতে জনবিক্ষোভ উস্কে দেয়। ভারতীয় মিডিয়াতে যেভাবে ত্রাণ সরবরাহের খবর এসেছে তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর কমপ্লেক্সটা কোনোভাবেই শুধু রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক মহলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পরে ভারতের নেপাল সংক্রান্ত নীতিতে হিন্দুত্ববাদী বিষয়গুলো নিয়ে আসা হলো। রাজতন্ত্রের অধীনে নেপাল ছিল একটি হিন্দু রাষ্ট্র। সেখানকার ৮০ শতাংশ নাগরিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী।

কিন্তু ২০১৫ সালে দুই তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যক আইনপ্রণেতা নেপালকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের এ সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান দেখানোর পরিবর্তে বিজেপি সরকার এর বিরোধিতা করে। সেইসঙ্গে দেশটিতে সংকট সৃষ্টির জন্য ভারতীয় বংশোদ্ভূত নেপালি গোষ্ঠী ‘মাধেসিকে’ ব্যবহার করে। মাধেসিদের সংবিধান পরিবর্তনের দাবিকে কেন্দ্র করে দেয়া হয় অর্থনৈতিক অবরোধ। এতে করে স্থলবেষ্টিত নেপালজুড়ে নেমে আসে ব্যাপক দুর্ভোগ। খাবার থেকে শুরু করে জ্বালানি পর্যন্ত আটকে দেয়া হয় সীমান্তে। একের পর এক অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে এটা ছিল সব থেকে খারাপ একটি পদক্ষেপ। এর সুবাদে অত্যন্ত লাভবান হয় চীন।

এরপর নেপালে ক্ষমতায় এসেছে চীনপন্থি একটি কমিউনিস্ট জোট। এছাড়া, সবসময়ই একটু বেশি বিচক্ষণ চীন ছোট দেশগুলোকে এমন বোঝাতে সক্ষম হয় যে, চীন তাদের অধিকারকে সম্মান করে। চীনের নানা ত্রাণ ও সহায়তা কার্যক্রম এবং অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলো ছোট দেশগুলোকে ক্রমশ বেইজিং নির্ভরশীল করে তুলতে পারে। তবে, সহানুভূতি ও সদয় আচরণের অনুপস্থিতি পার্থক্য গড়ে তোলে বটে। বর্তমান ভারতের হিন্দুত্ববাদ চিত্র যদি নেপালের মতো একটি হিন্দু প্রধান দেশকেই অনাগ্রহী করে তোলে তাহলে অন্য ধর্মপ্রধান প্রতিবেশীদের ওপর এর প্রভাব কেমন তা সহজেই অনুমেয়। ভারতে সে দেশে আশ্রয় নেয়া ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে দিতে চায়। তাদের এ পরিকল্পনা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এছাড়া সীমান্ত বাণিজ্য একটি বড় বিতর্কের বিষয়। মিয়ানমারের কার্যত নেতা অং সান সুচি চীন সফর করেছেন। এসময় চীন সড়কপথে অর্থনৈতিক করিডোরসহ মিয়ানমারের কাছে আরো কিছু সুবিধা প্রাপ্তির প্রস্তাব দেয়। ভারতের সঙ্গে সুচির সম্পর্ক আবেগী। কেননা তিনি সেখানে লেখাপড়া করেছেন।

কিন্তু ওই বন্ধনের কোনো প্রাসঙ্গিকতা এখন নেই। এদিকে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু স্থানীয় হিন্দুদের প্রতি মুসলিমদের বিরোধের মনোভাব দমন করতে পারছেন না তিনি। অন্যদিকে, ভারত বাংলাদেশের সীমান্তে বিদ্যমান সমস্যাগুলো খাদ্য, গবাদিপশু, ওষুধ ও মাদকদ্রব্য চোরাচালানে আগ্রহী ব্যবসায়ী মহলের সুবাদে সমস্যাই থাকছে। আর সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার চীনঘেঁষা হয়ে ওঠার বিষয়টি ভারতের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক। শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলীয় হাম্বানটোটা বন্দর এক রকম কিনে নিয়েছে চীন। এতে কৌশলগত দিক দিয়ে চীন তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে। আরো একশ’ বছর পরবর্তী দৃশ্যপটে চোখ চীনের। আর ভারতের চিন্তা পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন নিয়ে।

আমাদের নীতিনির্ধারকদের ২০০৭ সালে বাংলাদেশি লেখিকা তাহমিনা আনামের দেয়া মতামতের ওপর নজর দেয়া উচিত। তখন তিনি বলেছিলেন, ভারত মারাত্মকভাবে আত্মকেন্দ্রিক। তিনি দুর্বলের ওপর দেশটির অদ্ভুত আধিপত্যের বিষয়টি তুলে ধরেন। বলেন, ‘আমরা ভারতকে ভালোবাসতে পারি না। সম্প্রীতির ক্ষেত্রে আমাদের সম্পর্ক একেবারেই অসম।’ কিন্তু বিস্ময়ের কথা হলো, চীন ভারতের চেয়েও শক্তিশালী এবং আন্তর্জাতিক মহলে তাদের বর্তমান কর্মকাণ্ডগুলো আরো ‘আক্রমণাত্মকভাবে আত্মকেন্দ্রিক’।

টিজেএস জর্জ।

(সম্প্রতি ‘দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নিবন্ধের অনূবাদ)

লেখাটি ৩২২ বার পড়া হয়েছে
নিউজ অর্গান টোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


Share


Related Articles

Comments

ফেসবুক/টুইটার থেকে সরাসরি প্রকাশিত মন্তব্য পাঠকের নিজস্ব ও ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোট ভিসিটর সংখ্যা
৭৮৫২১৩৮৪

অনলাইন ভোট

image
মাদক বিরোধী অভিযানের নামে অব্যাহত ক্রসফায়ার সমর্থন করেন কি?

আপনার মতামত
হ্যাঁ
না
ভোট দিয়েছেন ১১২ জন

আজকের উক্তি

নির্বাচনকালীন সরকার কিংবা সহায়ক সরকার বিষয়টি রাজনৈতিক, এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই: প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা
Changer.com - Instant Exchanger