রাজনীতি

'কোটা বিষয়ে সংবিধানের অবস্থান'

image
Sat, April 14
01:22 2018

ইকতেদার আহমেদ:

‘কোটা’ একটি ইংরেজি শব্দ। ইংরেজিতে কোটার সমার্থক প্রোপরশনাল শেয়ার, যার বাংলা অর্থ আনুপাতিক অংশ। ইংরেজি কোটা শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দ হিসেবে ব্যবহারের ফলে এটি অনেকটা প্রচলিত বাংলা শব্দ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে বর্তমানে সর্বক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলায় কোটা বলতে আমরা আনুপাতিক অংশ বা নির্দিষ্ট ভাগ বুঝলেও আক্ষরিকভাবে আমরা সবসময় কোটা শব্দটিই ব্যবহার করে আসছি। আমাদের সংবিধানে কোথাও স্পষ্টভাবে কোটার বিষয় উল্লেখ না থাকলেও নারী বা শিশুদের অনুকূলে বা নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতি বা উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভের জন্য প্রচলিত নীতি ও অধিকারের ব্যত্যয়ে বিশেষ বিধান প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার একটি অন্যতম মূলনীতি হল সুযোগের সমতা। এ বিষয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯-এর দফা ১, ২ ও ৩-এ পর্যায়ক্রমিকভাবে বলা হয়েছে- ১. সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হবে; ২. মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করার জন্য, নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধাদান নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, ৩. জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।

সংবিধান প্রণয়নকালীন অনুচ্ছেদ ১৯ দফা ১ ও ২ সমন্বয়ে গঠিত ছিল। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদটিতে দফা ৩ সন্নিবেশিত হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানে যেসব অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে সেসব অধিকার বলবৎ করার জন্য সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২-এর দফা ১ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের কাছে মামলা রুজু করার অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। এ অধিকারটি যে কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বলবতের দাবি করে প্রতিকার চাইতে পারে, যদিও রাষ্ট্র পরিচালনার যে কোনো মূলনীতির কারণে অনুরূপ অধিকারবঞ্চিত ব্যক্তিকে সমসুযোগ প্রদান করা হয়নি।

সংবিধানে মৌলিক অধিকারবিষয়ক যে দুটি অনুচ্ছেদে বিশেষ বিধান প্রণয়নের বিষয় উল্লিখিত হয়েছে এর একটি হল অনুচ্ছেদ ২৮, যা বিভিন্ন কারণে বৈষম্যবিষয়ক এবং অপরটি অনুচ্ছেদ ২৯, যা সরকারি নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতাবিষয়ক। উপরোক্ত দুটি অনুচ্ছেদের মধ্যে প্রথমোক্তটির দফা ৪ এবং শেষোক্তটির দফা ৩(ক) বিশেষ বিধান প্রণয়নবিষয়ক, যা ভাবার্থগতভাবে কোটা প্রথা সংরক্ষণের পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮-এর দফা ৪-এ বলা হয়েছে- নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হতে এ অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করবে না। অপরদিকে অনুচ্ছেদ ২৯-এর দফা ৩(ক)-এ বলা হয়েছে- এ অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশ যাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করতে পারে, সে উদ্দেশ্যে তাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করা থেকে রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করবে না।

আমাদের দেশে বর্তমানে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী ছাড়া সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা প্রথা মেনে চলা হয়। বর্তমানে কোটা হারের যে বিভাজন তা হল মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা নাতি-নাতনি শতকরা ৩০ ভাগ, নারী ১০ ভাগ, জেলা ১০ ভাগ, উপজাতি ৫ ভাগ, প্রতিবন্ধী ১ ভাগ- সর্বমোট ৫৬ ভাগ।

বিভিন্ন দেশে সমাজের যে কোনো অনগ্রসর বা অবহেলিত বা বঞ্চিত অংশ বা শ্রেণীর উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোটা প্রথা মেনে চলতে দেখা যায়। এটি একটি সাময়িক ব্যবস্থা এবং কোটা প্রথার সুফল ভোগ-পরবর্তী যখন যে কোনো অনগ্রসর বা অবহেলিত বা বঞ্চিত অংশ বা শ্রেণীর উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভের অবকাশ ঘটে তখন এর হার কমিয়ে আনা হয় বা ক্ষেত্রবিশেষে রহিত করা হয়।

আমাদের দেশে কোটা প্রথা প্রবর্তনকালীন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনি এর অন্তর্ভুক্ত ছিল না। বাংলাদেশ অভ্যুদয়-পরবর্তী সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদের শতকরা ৩০ ভাগ কোটা প্রদানের পেছনে যে যৌক্তিক কারণ ছিল তা হল- মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটে এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য তাদের অনেকের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের কারণে পরিবারগুলো যে ক্ষতির সম্মুখীন হয় তা পূরণকল্পে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা বা আনুকূল্য অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। এ পৃষ্ঠপোষকতা বা আনুকূল্যের কারণে কোটা প্রথার সুবাদে নির্ধারিত যোগ্যতাধারী মুক্তিযোদ্ধারা লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সাপেক্ষে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে চাকরির সুযোগ লাভ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে চাকরি থেকে অবসরের বয়স অন্যদের চেয়ে এক বছর অধিক করার কারণে তারা বর্তমানে ৬০ বছরে উন্নীত হওয়ার পর অবসরে যান।

মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের জীবন ও সহায়-সম্পদের মায়া বিপন্ন করে আত্মত্যাগের অভিপ্রায় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাদের কেউই বিনিময় প্রত্যাশী ছিলেন না এবং চাকরির কোটা বা বয়স বৃদ্ধি কোনোটিই তাদের আত্মত্যাগের সঙ্গে তুলনীয় নয়। যে লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও চেতনাকে লালন করে মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে মুক্ত করার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তা ছিল গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে। স্বাধীনতার ৪৬ বছর অতিবাহিত হলেও আমরা যেমন উপরোক্ত চেতনাকে লালন করে এ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে সমর্থ হইনি, অনুরূপ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান বা নাতি-নাতনিরা সমচেতনায় একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ- এ নিশ্চয়তা কি তাদের সবার কাছ থেকে পাওয়া সম্ভব? এ বাস্তবতায় মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান বা নাতি-নাতনিদের জন্য কোটা সংরক্ষণের অবকাশ আছে কিনা সে প্রশ্নটি এসে যায়। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান বা নাতি-নাতনিদের অনগ্রসর বা অবহেলিত বা বঞ্চিত অংশ বা শ্রেণী বলার অবকাশ আছে কিনা এটিও ভাবার বিষয়। আর যদি অবকাশ না-ই থেকে থাকে সেক্ষেত্রে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮(৪) ও ২৯(৩)(ক) আকৃষ্ট করার সুযোগ কোথায়?

নারী ও জেলা নামে বর্তমানে ১০ ভাগ করে যে ২০ ভাগ কোটা সংরক্ষণ করা হয়, তা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা আনুকূল্য লাভের কারণে উভয় শ্রেণীর অনগ্রসর বা অবহেলিত বা বঞ্চিত অবস্থানের উত্তরণে তাদের প্রধান শ্রেণীর সমপর্যায়ে নিয়ে এসেছে বা আসার উপক্রম ঘটিয়েছে।

উপজাতি নামে প্রারম্ভিক অবস্থায় যে কোটা প্রথা প্রবর্তিত হয়েছিল, তা বর্তমানে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়কে আকৃষ্ট করে। উপজাতিরা দীর্ঘদিন কোটার পৃষ্ঠপোষকতা বা আনুকূল্য ভোগ করে আসতে থাকলেও তাদের সমপর্যায়ের অপর তিন গোষ্ঠী সেভাবে পৃষ্ঠপোষকতা বা আনুকূল্য লাভ করেনি। আর তাই অপর তিন গোষ্ঠী যেন উপজাতিদের সঙ্গে সমবিবেচনায় নিজেদের অনগ্রসরতা বা অবহেলা বা বঞ্চনার অবসান ঘটাতে পারে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সচেষ্ট হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

কোটা প্রথা প্রবর্তনকালীন প্রতিবন্ধী নামে কোনো কোটা ছিল না। প্রতিবন্ধীদের কোটায় অন্তর্ভুক্ত করে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য বা পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এটি চিরস্থায়ীভাবে সংরক্ষণ বা সক্ষমতা অনুযায়ী তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।

সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে শতকরা ৫৬ ভাগ যদি কোটা প্রথার জন্য সংরক্ষণ করা হয় সেক্ষেত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় কৃতকার্য হওয়া মেধাবীরা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রার্থিত চাকরি লাভে ব্যর্থ হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দীর্ঘদিন ধরে কোটা প্রথার পৃষ্ঠপোষকতা বা আনুকূল্যে একজন কোটাধারী যেখানে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ন্যূনতম নম্বর পেয়ে চাকরি লাভের সুযোগ পায়, সেখানে ন্যূনতম নম্বর থেকে শতকরা ১০ ভাগের অধিক নম্বরপ্রাপ্ত হয়েও অনেক কোটাবহির্ভূত মেধাবীর চাকরি লাভের সুযোগ ঘটে না। এ বৈষম্য যে কোনো মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীর জন্য মর্মবেদনা ও পীড়াদায়ক।

সংবিধান ও আইন মেনে চলা দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য কর্তব্য। কোটা বিষয়ে সংবিধানের যে অবস্থান তা থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে কোটা প্রথা অনুসৃত হওয়ার সুবাদে কোটাধারীদের অবস্থানের উত্তরণ ঘটেছে। এ অবস্থায় উপরোল্লিখিত আলোচনার আলোকে সামগ্রিক বিবেচনায় কোনো কোটা সম্পূর্ণ বিলুপ্তি, কোনোটি সংস্কার আবার কোনোটি সংরক্ষণের দাবি রাখে।

ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]

লেখাটি ১৪৩ বার পড়া হয়েছে
নিউজ অর্গান টোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


Share


Related Articles

Comments

ফেসবুক/টুইটার থেকে সরাসরি প্রকাশিত মন্তব্য পাঠকের নিজস্ব ও ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোট ভিসিটর সংখ্যা
৬৯৭০২৩৯৪

অনলাইন ভোট

image
ধর্ষণ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় আপনি কি মনে করেন ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত?

আপনার মতামত
হ্যাঁ
না
ভোট দিয়েছেন ৩২ জন

আজকের উক্তি

নির্বাচনকালীন সরকার কিংবা সহায়ক সরকার বিষয়টি রাজনৈতিক, এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই: প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা