রাজনীতি

পেছনে হাঁটা মানুষ; আমার দেখা একটি সত্য ঘটনা!

image
Sat, May 5
08:40 2018

মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান (অব.):

আমার দেখা একটি সত্য ঘটনা। সাল তারিখ মনে নাই। আমার বয়স তখন কত হবে ঠিক জানা নাই। ওটা ছিল হাট থেকে বাদাম-ভাজা কিনে খাবার বয়স। হবে হয়তো ৮/৯ বছর। আমাদের গ্রামের পুর্ব প্রান্ত দিয়ে আত্রাই নদী প্রবাহিত।

ঐসময় আত্রাই নদী প্রমত্তা ছিল। বর্ষায় নদীতে বান ডাকতো। শীতের সময় মাঝ নদীতে বুক পানি থাকতো। জেলারা সারা বছর মাছ ধরতো নদীতে। আমাদের গ্রামের উওর মাথায় আত্রাই এবং আত্রাই নদীর শাখা কাঁকড়া নদী আত্রাই নদীর সাথে মিলিত হয়ে মোহনা সৃষ্টি করেছে।

আমরা দুই নদীর এই মিলনস্হানকে ' দুই মোহনা' বলি। এই দুই মোহনা মিলনস্হালে একটি গভীর কুম আছে যার গভীরতা ঐসময় ঠাহর করা যেতোনা। বর্তমানে ঐকুম আর নাই। তবে অতিসম্প্রতি মোহনপুর রাবার ড্যাম হবার ফলে কুমের গভীরতা কিছুটা বেড়েছে। এই ' দুই মোহনা' থেকে সম্ভবতঃ আমাদের গ্রামের নাম মোহনপুর হয়ে থাকতে পারে।

তখন মোহনপুর ব্রিজ হয়নি তাই নদী পারাপারের জন্য নৌকা ব্যাবহার হতো। আমাদের পরিবারের ব্যবহারের জন্য একটি পানসি নৌকা ছিল যাতে করে আমরা নদীপথ চলাচল করতাম। রাতে এবং দিনে আমার বাবার বড়ভাই শহীদ মহির উদ্দীন এই নৌকা দিয়ে নদীতে মাছ শিকার করতেন। আমরা আমাদের বাবার বড়ভাইকে বড়বাপু বলে ডাকতাম। মোহনপুর যুদ্ধের সময় ৭১ সালে তিনি পাকিস্তান আর্মির গুলিতে শাহাদাত বরন করেন।

আমার বাল্যকালের ঘটনা। সময়টা সম্ভবতঃ ভাদ্র মাস হবে। আমার বড়বাপু, আমি এবং বাড়ির কাজের লোক আমাদের গ্রামের দুখু (জীবিত) এই তিন জন আত্রাই নদী দিয়ে আমাদের পানসি নৌকা করে আমাদের গ্রামের উওরে দুই কিলোমিটার দুরের লক্ষীতলা হাটে এলাম।

তখন দুপুর থেকে হাট বসতে শুরু করতো। হাটে স্হায়ী স্হাপনা, দোকানপাট কিংবা ইমারত ছিল না এখনকার মতো। সমস্ত হাটে থাকতো চার খুঁটির উপরে দোচালা ঘর যার নীচে দোকানি দোকান খুলে বসতো। বিকালে হাটে মেইন বেচাকেনা হতো। হাট শেষ হয়ে যেতো রাত ৮ টার পরে। যে যার মতো রাতে দোকান গুটিয়ে চলে যেতো। এর পরে সব ফাঁকা।

জ্যোছনা রাত। হাট শেষে আমরা নৌকার কাছে নদীর পাড়ে ফিরে এসেছি বাড়ি ফিরবো বলে। হঠাৎ আমি জেদ ধরে বসলাম বাদাম ভাজা খাবো। আমার বড়বাপু অনেক বুঝালেন এখন হাটে কেউ নাই বাদাম কোথায় পাবো? আমি নাছোড়বান্দা।

অগত্যা আমার বড়বাপু আর দুখু বাজারে যাবার আগে আমাকে বললো তুমি একাই থাকতে পারবে? আমি বললাম পারবো। আমি এখনো বুঝতে পারিনা ওদের একজন আমার সাথে থাকতে পারতেন। একজন বাজারে বাদাম কিনতে যেতে পারতো। কিন্তু ওরা দুজনে আমাকে একা রেখে বাজারে চলে গেল।

আমি নৌকার সামনে গুলোই এর দিকে যেখানে বৈঠার সাথে নৌকাটা বাঁধা আছে বৈঠা ধরে বসে আছি। আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি কোনোপ্রকার ভয় পাইনি। নদীর ঐ জায়গাটা ছিল হিন্দুদের শ্মশান ঘাট। পশ্চিমের দিকে জিগার গাছের সারি। একটা ভাঙ্গা বেড়া। একটু আবছা অন্ধকার। আমি পশ্চিমে হাটের পথের দিকে চেয়ে বসে আছি।

এমন সময় দেখলাম একজন মানুষ ২৫/৩০ বছরের মতো বয়স অন্ধকার থেকে বের হয়ে আমার দিকে আসছে। খালি গা পরনে সামান্য কাপড় লুঙ্গির মালকোচার মতো মনে হচ্ছে। গায়ের রং ফর্সার দিকে। উচ্চতা ৫ ফুট ৪ ইঞ্চির মতো। সে আমাকে দেখতে পায়নি কিন্তু আমি ওকে দেখছি। আমার থেকে ১০ /১২ গজ দুরে থাকতে সে আমাকে দেখে থমকে দাঁড়াল।

আমি ওকে দেখছি সে আমাকে দেখছে। এটাই আশ্চর্য যে আমি কোনোপ্রকার ভয় পাইনি। জ্যোছনা রাত বলে আমি তাকে স্পষ্ট দেখছিলাম। প্রায় ৩০ সেকেন্ডের মতো দাঁড়িয়ে থেকে লোকটি ধীরে ধীরে পিছনে হেটে আলো আঁধারির মধ্যে গিয়ে ধীরে ধীরে বসে অদৃশ্য হয়ে গেল।

ঠিক তখনি আমি বড়বাপুর গলার আওয়াজ পেলাম। আমার বড়বাপু জোরে জোরে বলছেন বেটা ভয় পাওনিতো? আমি লোকটির অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার স্হানটি দেখিয়ে দিয়ে বললাম তোমরা জলদি খোঁজে দেখ ওখানে একটি লোক লুকিয়ে আছে। আমর বড়বাপু বুঝতে পারলেন সে মানুষ নয়। তার পরেও অনেক খোঁজাখুঁজী করে ফিরে এসে আমার শরীরে দোয়া পড়ে ফুক দিলেন। আমরা বাড়িতে ফিরে এলাম।

আমি আজও এর এক বিন্দুও ভুলিনি। মনে হয় কালকের ঘটনা। ঐ লোকটির চেহারা আজও আমার চোখের সামনে ভাসে। এটাকে আপনারা কি বলবেন?

লেখক: কলামিস্ট ও প্রাক্তন মহাপরিচালক বিডিআর।

লেখাটি ১০৬১ বার পড়া হয়েছে
নিউজ অর্গান টোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


Share


Related Articles

Comments

ফেসবুক/টুইটার থেকে সরাসরি প্রকাশিত মন্তব্য পাঠকের নিজস্ব ও ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোট ভিসিটর সংখ্যা
৭১৬৮৩৮৮৪

অনলাইন ভোট

image
ধর্ষণ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় আপনি কি মনে করেন ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত?

আপনার মতামত
হ্যাঁ
না
ভোট দিয়েছেন ৬৭ জন

আজকের উক্তি

নির্বাচনকালীন সরকার কিংবা সহায়ক সরকার বিষয়টি রাজনৈতিক, এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই: প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা