রাজনীতি

শশুরবাড়ীর ইফতারি সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি 'নাকি 'সামাজিক অভিচার?

image
Sat, May 19
12:52 2018

আছমা জান্নাত মনি:

যোগ যোগ ধরে আমাদের সমাজে প্রচলিত হয়ে আসছে শশুর বাড়ীর ইফতারি নামক এক সামাজিক নীরব অভিচার।শুধু মাত্র অভিচারই নয়।একটা প্রচলিত কুসংস্কার বটে।যোগ যোগ ধরে এই অভিচারের বলি হয়ে আসছে একটা মেয়ের বাবা বা তার অভিভাবক।

একমাত্র ভুক্তভোগী পরিবার জানে এই কুসংস্কারের বলি হয়ে তারা কতটা জর্জরিত।জন্মের পর থেকে একটা মেয়ে সম্পূর্ণভাবে তার পরিবারের উপর নির্ভরশীল।বিয়ের আগ পর্যন্ত তার যাবতীয় খরচ তার পরিবারই বহন করে তাকে।১৮ / ২০ টা বছর ভরণ পোষণ করে কোনরূপ প্রতিদান না নিয়েই একজন বাবা তার মেয়েকে পাত্রস্থ করে। সেই বিয়েতে মেয়ের বাবাকে/অভিভাবক কে জামাই বাড়ির কত রকম আবদার নীরবে সহ্য করে মিটাতে হয়।

বিয়ের সময় ছেলে পক্ষ কে ধুমধাম করে খাওয়াতে হবে,ভালো ফার্নিচার দিতে হবে।ফার্নিচার বলতে রান্নাঘরের থালাবাসন থেকে শুরু করে সোফা,ফ্রিজ, আলমারি, পালং,চেয়ার-টেবিল,ড্রেসিং টেবিল, বেড আরও অনেক কিছু।এক কথায়, একটা ঘর সাজানোর জন্য যা যা লাগে সেই সব কিছু যেন ছেলের বিয়েতেই শশুর বাড়ি থেকে উসুল করতে চায়।

আর এটা আমরা বিন্দু মাত্র লজ্জিত হয়ে চাইনা,বরং মনে করি এটা আমাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে।আচ্ছা এতো দিন কি ছেলে পক্ষ বস্তিতে বা রাস্তায় জীবন যাপন করতো।মনে হয় তাই হবে।আর তাই বিয়ে করে শশুরের কাঁধে চড়ে সভ্যতার যাত্রা শুরু করতে চায়।সাধ্য অনুযায়ী বরপক্ষের এসব আবদার মিটিয়ে দিয়েই বিয়ে হয়ে যায়।তাহলে কি বিয়ে হয়ে গেলেই মেয়েপক্ষ স্বস্তির নিঃশাস নিতে পারছে?মোটেও নাহ!

#বরং বিয়ের প্রাথমিক ধাপ শেষ করে স্ব জ্ঞানে বাকি জীবন সিজন ভিত্তিক অভিচার মেয়ে পক্ষকে সহ্য করে য়াওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে।আর সেই বন্দোবস্ত অনুযায়ী আপনাকে চলতেই হবে।আপনার বিভিন্ন উপঢৌকন নির্ভর করবে আপনার মেয়ে সুখে থাকার অবস্থা।মেয়ের সুখের জন্য মেয়ের অভিভাবক রা দিনের পর দিন শশুর বাড়ির এইসব জুলুম নীরবে সহ্য করেই যায়।

###ইফতারি, নাইওরী বাবার/অভিভাকরের বুকে সভ্য সমাজে অসভ্যতার তীর...

আমরা আধুনিক আর সভ্যতার জয়গান করছি,তবে মেয়ের বাবার প্রতি এই অভিচার কেন।রমজান মাস আর সিজন ভিত্তিক নাইওরীর সময় হলে বাবার বা অভিভাবকের চিন্তা বাড়তেই থাকে।মেয়েকে/বোন কে কিভাবে ইফতারি দেবে,কিভাবে নাইওরী দেবে।ভালো করে ইফতারি /নাইওরী না দিলে মেয়েকে শশুরবাড়ি আর আশপাশের কটুকথা শোনতে হবে।

এক রমাযান মাসেই ৩ বার ইফতারি আসা চাই।তাও আবার যেমন তেমন ইফতারি না।আশপাশ যেভাবে জানে সেইভাবে আনত হবে।গর্ব করে যাতে আশপাশে বলতে পারা যায় এমন করে আনতে হবে।একটু কম হলেই মেয়ের কপালে কটু কথার ঝড় বয়ে যায়।

এমন কি উদাহরণ দিয়ে বলতে থাকে, অমুকের ছেলের বউর ঘর ভর্তি ইফতারি এসেছে।সারাটা গ্রাম বিলিয়ে দিয়েছে।কিন্তু আমি আমার আত্নীয়কেই দিতে পারিনি।লজ্জায় আমি মুখ দেখাতেই পারছিনা।এরকম নানা কথা কোন কোন পরিবারে ছেলের বউকে শোনতে হয়।কিন্তু কেন এই অসভ্যতা আর অবিচার?।

* এইসব ইফতারি কয়টা পরিবার স্বানন্দে তার মেয়ের বাড়ি দিয়ে থাকে,হাতেগুনা কয়েক টা পরিবার পরে শুধুমাত্র মেয়ের/বোনের মুখ রক্ষার্থে সামাজিক এই কুনীতি অনেক গুলা পরিবার বয়ে যাচ্ছে।কোনরূপ আনন্দ ছাড়াই মেয়ে পক্ষ বলিদান হয়ে যাচ্ছে।

সবচাইতে বেশী নির্মমতার স্বীকার সমাজের দারিদ্র্য ও মিডিলক্লাস পরিবার গুলা। দারিদ্র্য পরিবার গুলা মেয়ের সুখের জন্য সুদে টাকা এনে হলেও মেয়ের বাড়ি ইফতারি দিতে হয়।শশুর বাড়ী যখন ইফতারি খাওয়া আর বিতরণে ব্যস্ত,হয়তো সেই রাতে মেয়ের বাবা চোখেরজলে বালিশ ভিজাচ্ছে।কিভাবে সে টাকা পরিশোধ করবে।সেই টাকার চিন্তা শেষ হতে না হতেই দেখা যায় আরেকটা নাইওরীর সময় হয়ে গেছে।উফফফ, কি নির্মমতা!

আর মিডিলক্লাস পরিবার তো নিজের সম্মান রক্ষার্থে নিজে এক মাস কষ্ট করে থাকবে।তবুও মেয়ের বাড়ি ভালো করে ইফতারি দিতে হবে।না হলে কত লোক লজ্জায় তাদের আর তাদের মেয়ের কপালে থাকবে।
শুধু কি ইফতারি দিয়েই মেয়ে পক্ষ রেহাই পেয়ে যাচ্ছে।নাহ!।রমজান পরেই শুরু হয় সিজন ভিত্তিক বিভিন্ন নাইওরীর পালা। একটার পর একটা নাইওরী চলতেই আছে। আম কাঁঠাল নাইওরী,শীতকালীন পিঠা নাইওরী আরও অনেক কিছু। বিভিন্ন বিশেষ দিনে আরও কত কিছু ছেলের বাড়ি পাঠাতে হয়।হায় এ কেমন অভিচার?।

আপনি একটা মেয়েকে বিয়ে করেছেন নাকি আপনার ১৪গুষ্ঠীর খাওয়া দাওয়ার দায়িত্ব মেয়ের বাড়ির সাথে বন্দোবস্ত হয়েছে?।

#সমাজের কিছু কিছু ভিত্তবান মানুষের বিলাসিতা বাকি হাজার টা পরিবারের সুখ জীবন থেকে কেড়ে নিচ্ছে।তাদের একেক টা বিলাসী কর্মকাণ্ড পরবর্তী হাজার পরিবারের নির্মমতার কারণ হচ্ছে।অনেকে বলে থাকেন এসব ইফতারি নাইওরী দিলে সামাজিক সম্পর্ক বাড়ে।পারস্পারিক মায়া মমতা বাড়ে।বাহ,এক পক্ষ সারা জীবন দিতেই আছে।আর আপনি সারা জীবন খেয়েই যাচ্ছেন। এতে সম্পর্ক বৃদ্বি হচ্ছেনা।বরং এই দেওয়ার অনন্তরলে লুকিয়ে থাকে হাজার হাজার অশ্রু আর মেয়ের জামাই বাড়ির প্রতি নীরব ঘৃণা।

আসুন, আপনার সিজন ভিত্তিক একদিনের নাইওরী আর ইফতারি খাওয়ার আনন্দ করে অন্য পরিবারের সারাটা মাস বছরের চিন্তার কারণ না হই।আপনি মেয়ে কে নিয়ে সুখে থাকুন,আর মেয়ের পরিবার কে এই সামাজিক অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়ে একটু শান্তিতে থাকতে দিন।

মেয়ের বাড়ির কোন উপঢৌকনের আশা না করে সেই মেয়েকেই আপনার এবং আপনার পরিবারের জন্য তার বাবার/অভিভাবকের কাছ থেকে শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবেই গ্রহণ করুন।সর্বশেষ ইফতারি /নাইওরী এই কুসংস্কার কে না বলুন।

লেখক; সাংবাদিক ও সমাজকর্মী।

লেখাটি ২৬৫ বার পড়া হয়েছে
নিউজ অর্গান টোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


Share


Related Articles

Comments

ফেসবুক/টুইটার থেকে সরাসরি প্রকাশিত মন্তব্য পাঠকের নিজস্ব ও ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোট ভিসিটর সংখ্যা
৭৩২৮১৩৮৪

অনলাইন ভোট

image
মাদক বিরোধী অভিযানের নামে অব্যাহত ক্রসফায়ার সমর্থন করেন কি?

আপনার মতামত
হ্যাঁ
না
ভোট দিয়েছেন ৫১ জন

আজকের উক্তি

নির্বাচনকালীন সরকার কিংবা সহায়ক সরকার বিষয়টি রাজনৈতিক, এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই: প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা