রাজনীতি

লর্ড কার্লাইলকে দিল্লি থেকে পুশ ব্যাক ভারতীয় গণতন্ত্রের চেহারা উদঘাটন

image
Thu, July 12
04:52 2018

মোবায়েদুর রহমান:

লর্ড কার্লাইলকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তাকে ভারতেও ঢুকতে দেওয়া হলো না। ভারতে ঢুকেও তাকে তৎক্ষণাৎ ফেরত যেতে হলো। এ যেন পত্র পাঠ বিদায়। বুধবার রাত ১০টায় ইংল্যান্ড থেকে তিনি দিল্লি বিমান বন্দরে নামেন। কিন্তু বিমান বন্দর থেকে তাকে বেরোতে দেওয়া হয়নি। বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশনেই তাকে বসিয়ে রাখা হয়। লর্ড কার্লাইলের দেখাশোনার জন্য যে মহিলা বিমান বন্দরে উপস্থিত ছিলেন তিনি ইমিগ্রেশনকে বলেন যে, লর্ড কার্লাইলকে তো ভারত ভিসা দিয়েছে। সেই ভিসা নিয়েই তিনি দিল্লি এসেছেন। এখন তাকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না কেন? উত্তরে বলা হয় যে, তাকে ভিসা দেওয়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এর মধ্যে ভারত সেই ভিসা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সুতরাং তাকে এখন ফেরত যেতে হবে। এর কিছুক্ষণ পর ফিরতি ফ্লাইটে তাকে ইংল্যান্ড ফেরত পাঠানো হয়।

ইমিগ্রেশনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, কার্লাইলকে ভিসা দিয়ে আবার সেটি প্রত্যাহার করা হলো কেন? উত্তরে বলা হয় যে, ভিসা ফর্ম পূরণ করার সময় তিনি সুনির্দিষ্ট ভাবে বলেননি যে, তিনি কেনো ভারত সফরে এসেছেন। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে যে, তিনি একটি সংবাদ সন্মেলন করার জন্য দিল্লি আসছেন। দিল্লির যে মিলনায়তনে তিনি সংবাদ সন্মেলন করতে চেয়েছিলেন সেই হলের কর্তৃপক্ষ সেখানে কার্লাইলকে সংবাদ সন্মেলন করার অনুমতি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।তাই তার জন্য ভিন্ন একটি স্থানে সংবাদ সন্মেলনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তখন বিমান বন্দর ইমিগ্রেশন বলে যে, এত কথা তাদের জানার কথা নয়। যেহেতু তার ভিসা প্রত্যাহার করা হয়েছে সেই জন্য তাকে ফিরতি ফ্লাইটেই ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো কেনো তিনি দিল্লি এসেছিলেন? আর কেনোই বা তার ভিসা ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্রত্যাহার করা হলো? সেটি জানতে একটু বাংলাদেশের দিকে তাকাতে হবে।

গত ১০ জুলাই মঙ্গলবার একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে বিবিসির সংবাদে বলা হয় যে, লর্ড কার্লাইল দিল্লিতে আসছেন এ খবর জানাজানি হওয়ার পরই ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশন ভারতের কাছে তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছে। এমনকি, দু-তিনদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ভারত সফরে এসে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর এবং রাম মাধবের মতো বিজেপির শীর্ষ নেতাদের সাক্ষাতের সময় প্রসঙ্গটি উঠিয়েছেন।

লর্ড কার্লাইলকে ভারতে এসে সংবাদ সম্মেলন করতে দেয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি সম্পর্কে ঢাকার পক্ষ থেকে যে যুক্তি দেয়া হয়েছে সেটি এরকম-লর্ড কার্লাইল খালেদা জিয়ার হয়ে মামলা লড়তে আর্থিকভাবে চুক্তিবদ্ধ। ফলে দিল্লিতে তিনি যে সব কথা বলতে আসছেন সেগুলো একটা'পেইড রাজনৈতিক ক্যাম্পেনে'র অংশ -যার নিশানা হল বাংলাদেশ সরকার। ঢাকার পক্ষ থেকে এমন কথাও বলা হয়েছে যে এখন বাংলাদেশ যেভাবে তাদের ভূখন্ডকে ভারত-বিরোধী কার্যকলাপের জন্য ব্যবহৃত হতে দেয়া হয়না, সেভাবে ভারতেরও উচিত নয় দিল্লির মাটিকে বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারের জন্য ব্যবহৃত হতে দেওয়া।

বাংলাদেশের একটি শীর্ষ কূটনৈতিক সূত্র বিবিসি বাংলাকে এমনও বলেছেন,"লর্ড কার্লাইল ভারতে এসে তাজমহল বেড়াতে যান, ইন্ডিয়া গেটে হাওয়া খান-আমাদের কিছুই বলার নেই। কিন্তু দিলি সফরকে তিনি যদি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচারে কাজে লাগান তাও আবার পয়সা নিয়ে, সেটা মোটেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনও ভাল সঙ্কেত দেবে না।"

চাপের মুখে ভেন্যু বাতিল

লর্ড কার্লাইল চেয়ে ছিলেন ১৩ জুলাই দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব বা এফসিসিতে তিনি মিডিয়ার মুখোমুখি হবেন এবং সেভাবে ওই ক্লাবের মিলনায়তনটি প্রাথমিকভাবে বুকিংও করে রেখেছিলেন। কিন্তু শেষ মুহুর্তে এফসিসি তার বুকিং বাতিল করে দিয়েছেন। ফলে লর্ড কার্লাইল এখন দিল্লিতেই অন্য কোনও জায়গায় সাংবাদিক সম্মেলন করতে বাধ্য হচ্ছেন - আর তার দিনটাও একদিন এগিয়ে এনে ১২ জুলাই বৃহস্পতিবার করা হয়েছে। তবে লন্ডনে বিমানে ওঠার আগে তিনি বিবিসিকে হোয়াটসঅ্যাপে জানিয়েছেন, তার দিল্লি সফর মোটেও বাতিল হচ্ছে না - এবং খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে মামলা নিয়ে তিনি কথা বলতে চান, সেটাও দিল্লিতে অবশ্যই বলবেন।

ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইলকে ভারতে আসতে না দিলে প্রমাণিত হবে বেগম খালেদা জিয়ার সাজার পেছনে সে দেশের হাইকমিশনের নেপথ্য ভূমিকা রয়েছে। এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। রবিবার (৮ জুলাই) নয়াপল্টন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। জনাব রিজভী বলেন ১৩ জুলাই ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা ও কারাদন্ডের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে কার্লাইলের বক্তব্য দেয়ার কথা। যদি ঢাকাস্থ হাইকমিশনের জোরালো সুপারিশের কারণে লর্ড কার্লাইলের ভিসা দেয়া না হয় তাহলে এটা প্রমাণিত হবে যে, বেগম জিয়াকে মিথ্যা মামলায় কারাদন্ড দিতে হাইকমিশনের নেপথ্য ভূমিকা রয়েছে।’ ‘ভারতীয় হাইকমিশনের এই ভূমিকা দুঃখজনক এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আগ্রাসী হস্তক্ষেপ। তিনি বলেন,বাংলাদেশের একটি ভোটার বিহীন সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভারতীয় হাই কমিশনের কর্মকর্তাদের ভূমিকা ঔপনিবেশিক শাসকদের ন্যায়।মনে হয় তারা বাংলাদেশে তাদের প্রতিভূদের টিকিয়ে রাখতে উঠে পড়ে লেগেছে। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশন যদি ঔপনিবেশিক শাসনের গভর্নর হাউজের ন্যায় বাংলাদেশের অভ্যান্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিপন্ন ও সার্বভৌমত্ব অতি দুর্বল।’

এখন বোঝা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনের জোর সুপারিশে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদির সরকার লর্ড কার্লাইলকে ইস্যু করা ভিসা প্রত্যাহার করেছেন এবং ভারতের মাটিতে অবতরণ করার পরেও ফিরতি ফ্লাইটে তাকে লন্ডন পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনার পর রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্য সত্যি প্রমাণিত হয় কিনা সেটি পাঠক বন্ধুরা ঠান্ডা মাথায় বিবেচনা করবেন। যারা বলেন যে আওয়ামী সরকার এবং নরেন্দ্র মোদি সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক শিথিল হয়েছে তারা এই ঘটনাটি ঠান্ডা মাথায় বিবেচনা করবেন এবং ভেবে দেখবেন যে, সম্পর্ক কি সত্যি সত্যিই শিথিল হয়েছে? নাকি আরো দৃঢ় হয়েছে?

লেখক, কলামিস্ট ও এসোসিয়েট এডিটর, দৈনিক ইনকিলাব।

Email: [email protected]

লেখাটি ১৩৩৯ বার পড়া হয়েছে
নিউজ অর্গান টোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


Share


Related Articles

Comments

ফেসবুক/টুইটার থেকে সরাসরি প্রকাশিত মন্তব্য পাঠকের নিজস্ব ও ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোট ভিসিটর সংখ্যা
৭৭৯১৫৫৮৪

অনলাইন ভোট

image
মাদক বিরোধী অভিযানের নামে অব্যাহত ক্রসফায়ার সমর্থন করেন কি?

আপনার মতামত
হ্যাঁ
না
ভোট দিয়েছেন ১০৫ জন

আজকের উক্তি

নির্বাচনকালীন সরকার কিংবা সহায়ক সরকার বিষয়টি রাজনৈতিক, এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই: প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা
Changer.com - Instant Exchanger