রাজনীতি

'পদ্মাসেতু কেমন করে এলো মাওয়া-শরীয়তপুরে?'

image
Tue, September 11
03:33 2018

শামসুল আলম:

২০০৪ সালের মাঝামাঝি। যোগাযোগ মন্ত্রনালয় থেকে এক অফিসার ফোন করলেন (নামটা উহ্য রাখছি), জরুরী কথা আছে। আমি তখন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-১। তিনি যা বললেন তার মর্মার্থ এরূপ- যোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিষ্টার নাজমুল হুদা পদ্মাসেতুর সামারি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পঠিয়েছেন অনুমোদনের জন্য। তবে এতে তিনি ব্রীজ চুড়ান্ত করেছেন আরিচা দিয়ে, যদিও জাইকার সমীক্ষায় সুপারিশ আছে মাওয়া দিয়ে। মাওয়া পয়েন্টই দূরত্ব কম, বেশি এলাকা কাভার করবে এবং খরচও পড়বে কম। কিন্তু নাজমুল হুদা সাহেব আরিচায় নিয়ে গেছেন, কেবল তার স্ত্রী সিগমা হুদার কথায়, কারন তার শ্বশুর বাড়ি ওই দিকে। মাথায় মোটামুটি ঢুকে গেলো পুরো বিষয়টা।

এরপরে খোঁজ রাখতে থাকলাম। ফাইল পেয়ে গেলাম, এবং সেটাকে ভালো করে স্টাডি করে ড্রয়ারে আটকে দিলাম। তারপরে মাত্র ৪/৫টা ফোন করলাম। মুন্সিগঞ্জে, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, এবং ফরিদপুরের বিএনপির নেতাদের। এর মধ্যে মূল দায়িত্ব দিলাম শরীয়তপুরে সভাপতি সাবেক মন্ত্রী টিএম গিয়াসউদ্দিনকে। আরও ফোন করলাম ফরিদপুরের সভাপতি শাহজাদা মিয়া, মাদারীপুরের খলিলুর রহমান ঠান্ডু চৌধুরী, শরীয়তপুরের সভাপতি শফিকুর রহমান কিরন এবং মজিবুর রহমান মাদবর, মুন্সিগঞ্জের সাবেক মন্ত্রী আবদুল হাই। তাঁদের বুঝিয়ে বললাম কি করতে হবে। সেমত কাজ হলো, ‘পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ’ নামে একটা সংগঠনের ব্যানারে ঢাকা-মাওয়া সড়ক অন্তত তিনদিন ধরে অবরোধ করে রাখতে হবে। সংগ্রাম পরিষদ হলো, গিয়াস ভাই সভাপতি, আমার প্রাক্তন কলিগ মজিবুর ভাই সেক্রেটারী। কাজে নেমে গেলেন উনারা। ঢাকা- মাওয়া রাস্তাটা বন্ধ হয়ে গেলো, মহাসড়কে কেবল মিছিল মিটিং, আর মানুষ। চরজানাজাতে বিশাল মিটিং সমাবেশ হলো, এতে বরিশাল বরগুণা থেকে শুরু করে ফরিদপুর বেল্টের প্রায় ১৬ জেলার বিভিন্ন দল মত পথে মানুষ সামিল হয়েছিল। এমনকি বিরোধী দল আওয়ামীলীগের স্থানীয় ও জাতীয় নেতারাও এসেছিলেন সেখানে। জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও এমপি আল্লামা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী সাহেব ঐ সভায় বক্তৃতা করেন, যার দরুন আওয়ামীলীগের রাজ্জাক সাহেব কথা দিয়েও সভায় উপস্থিত হননি, তবে উনার লোকজন পঠিয়েছিলেন।

সরকার পরিস্থিতির খোঁজখবর নিতে থাকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অবহিত করা হয়- পদ্মাসেতু বাস্তবায়ন পরিষদের দাবী ও আন্দোলনের কথা। তিনি নাজমুল হুদাকে ডেকে জানতে চাইলেন- বিষয়টা কি? এমন হলো কি করে? অবশেষে পদ্মাসেতু বাস্তবায়ন পরিষদের দাবী মেনে নিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সেতুর প্রস্তাবের সারংক্ষেপ সংশোধনের জন্য আর মন্ত্রনালয়ে ফেরত পাঠানো হয়নি। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিজেই হাতে ‘আরিচা’ কেটে ‘মাওয়া পয়েন্ট’ করে দিলেন। এরপরে বাকী সব প্রজেক্ট পেপার ওভাবে সংশোধিত হলো। পরের মার্চে ম্যাডাম নিজেই গেলেন ভিত্তিপ্রস্তর দিতে মাওয়াতে পয়েন্টে।

পরে অবশ্য রাজবাড়ি ও মানিকগঞ্জের লোকজন ঐদিক দিয়ে পদ্মাসেতুর জন্য একইরূপ আন্দোলন শুরু করে। এরপর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাজবাড়ি গিয়ে এক জনসভায় প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসেন- দ্বিতীয় পদ্মাসেতু করা হবে আরিচা দিয়ে।

এক যুগেরও বেশি সময় আগে সংঘটিত এই বিরাট ঘটনাটি হয়ত কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে একদা। পদ্মাসেতুর ওপর দিয়ে যানবাহন চলবে, কেউ জানবে না এখানে ব্রিজটি এলো কি করে। যে কাজটি আমি তখন করেছিলাম, একজন সরকারী কর্মকর্তা হিসাবে হয়ত ঠিক করিনি (ফাইল আটকে দেয়া), কিন্তু একটি অন্যায় সিদ্ধান্ত বন্ধ করতে জনগনের কাছে চলে গিয়েছিলাম। কাজটি সঠিকভাবে করার জন্য জনগনের দাবী প্রতিষ্ঠা করতে কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছিল মাত্র, এই ভেবে যে- অবহেলিত এই অঞ্চলটা যদি উন্নয়নের মুখ দেখে। যে মাটিতে আমার জন্ম এবং বড় হওয়া, তার প্রতি কিছুটা দায়িত্ববোধ প্রদর্শন করেছিলাম হয়তো। এর ভুলত্রুটি হয়ত ভবিষ্যতই মূল্যায়ন করবে। সময় বদলেছে, আর সেই সাথে বদলে যাচ্ছে মানুষ। আজ হয়ত পদ্মাসেতু নিয়ে অনেকে অনেক কিছু বলবেন, কিন্তু তারা জেনে রাখুন- কিভাবে পদ্মাসেতু মাওয়াতে এলো।


লেখক, কলামিস্ট, গবেষক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সহকারী।

লেখাটি ৫০৪ বার পড়া হয়েছে
নিউজ অর্গান টোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


Share


Related Articles

Comments

ফেসবুক/টুইটার থেকে সরাসরি প্রকাশিত মন্তব্য পাঠকের নিজস্ব ও ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোট ভিসিটর সংখ্যা
৭৯১৭৯৭৩৪

অনলাইন ভোট

image
মাদক বিরোধী অভিযানের নামে অব্যাহত ক্রসফায়ার সমর্থন করেন কি?

আপনার মতামত
হ্যাঁ
না
ভোট দিয়েছেন ১১৭ জন

আজকের উক্তি

নির্বাচনকালীন সরকার কিংবা সহায়ক সরকার বিষয়টি রাজনৈতিক, এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই: প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা
Changer.com - Instant Exchanger