এই মৃত্যু তালিকা কোথায় গিয়ে থামবে জানা নেই

শরিফুল হাসান।

করোনা বা যে কোন গুরুতর রোগে অসুস্থ কোনো রোগীকে চিকিৎসাসেবা প্রদানে অনীহা দেখালে এবং তাতে ওই রোগীর মৃত্যু ঘটলে ‘তা অবহেলাজনিত মৃত্যু’ অর্থাৎ ‘ফৌজদারি অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে আদেশ দিয়েছেন আদালত। সংক্রমণের শততম দিনে এসে এই আদেশ আর সবার সিএমএইচে ছোটা ছাড়া করোনা নিয়ে আজ নতুন কিছু পেলাম না।

আমার ধারণা ছিল, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা লাখ পেরুতে চলতি মাসটা লাগবে। লিখেছিলামও তাই। কিন্তু যেভাবে প্রতিদিন নতুন রেকর্ড হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে চলতি সপ্তাতেই লাখ ছাড়িয়ে যাবে। শততম দিনে আজ সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্তের সংখ্যা ৯০ হাজার ছাড়াল। আর মোট মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২০৯ জনের। এই মৃত্যু তালিকা কোথায় গিয়ে থামবে জানা নেই।

ভেবেছিলাম, এলাকাভিত্তিক কঠোর লকডাউনটা অন্তত হবে। তাতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু চারপাশের প্রস্তুতি আর নতুন করে পুরোনো নির্দেশনা দেখে মনে হচ্ছে, লাল হলুদ, সবুজেই শুধু ভাগ হবে। কাজের কাজ খুব বেশি কিছু হবে না। কারণ আজকে জারি করা নির্দেশনায় আলাদা করে বা নতুন করে আমার কিছু চোখে পড়েনি।

তবে আজকে আদালতের আদেশ ভালো লেগেছে। আদালত বলেছে, সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ কোনো রোগীকে চিকিৎসাসেবা প্রদানে অনীহা দেখালে এবং এতে ওই রোগীর মৃত্যু ঘটলে ‘তা অবহেলাজনিত মৃত্যু’ অর্থাৎ ‘ফৌজদারি অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হবে। হাইকোর্ট এজন্য দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতেো নির্দেশ দিয়েছে।

তবে আদালতের নির্দেশ কতোটা বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে আমার শঙ্কা আছে। কারণ বাস্তবায়নটা করবে কী? আদালত ঢাকা মহানগর ও জেলা, চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলাসহ বিভাগীয় শহরের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো যাতে কোভিড ও নন-কোভিড সব রোগীকে পরিপূর্ণ চিকিৎসাসেবা প্রদান করে, সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠন করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন।

আমাদের দেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অনেকবার লিখেছি। দেশে এখন মন্ত্রী-মেয়র-এমপি-সচিব সব পেশার লোক মারা যাচ্ছে। কষ্টের বিষয়টা কী জানেন এতোকিছুর পরেও আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলোর স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর দিকে যথেষ্ট নজর নেই। সিঙ্গাপুর-থাইল্যাণ্ড বন্ধ থাকলেও ভিআইপিরা এখনো ছুটছে সিএমএইচে।

আচ্ছা সিএমএএইচ তো আমাদের সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। তারা যদি একটা ব্যবস্থাপনায় সবকিছু আনতে পারবে সরকারি হাসপাতালগুলোকে কেন আনা যাবে না? সরকারি ব্যবস্থার ওপর যদি আস্থা না থাকে তাহলে আর্মি মেডিকেল কোরকে দেশের সব হাসপাতাল-ক্লিনিক চালানোর দায়িত্ব দিন। তারা একটা ব্যবস্থাপনায় আনুক সবকিছু। তাও দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবাটা ভালো হোক।

গত তিন মাস ধরে বারবার বলছি, সরকারি বেসরকারি সব হাসপাতালগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা হোক। হয়নি। বারবার বলছি, এই করোনার সময়ে যেসব হাসপাতাল-ক্লিনিক চিকিৎসা দেবেন না, ভবিষ্যতে সেগুলো চলতে দেয়া উচিত নয়। কারণ জাতির এই সংকটকালে চিকিৎসা না দিলে আর কবে দেবে?

আদালত আজকে সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য এবং রিফিলিংয়ের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। আমি জানি না কে কীভাবে এটা করবে? আচ্ছা আমাকে বলেন তো কথায় কথায় আমরা সরকারকে গালি দিচ্ছি তাহলে পাঁচ টাকার মাস্ক ২০ টাকা করছে কারা? সিলিন্ডারের দাম বাড়াচ্ছে কারা? এই যে সবসময় সুযোগ খোঁজা এজন্য দায়ী কে?

আমি মনে করি করোনার এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে আমরা সবকিছুকে জবাবদিহিতার আওতায় বা সুশাসনের আওতায় আনার চেষ্টা করতে পারতাম। আর জনগণ পারতো সচেতন হতো। অসংখ্যবার লিখেছি, একটা দেশে নাগিরকদের যেমন আইন মানতে হবে, সচেতন হতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও তার দায়িত্ব ঠিক মতো মানতে হবে। অথচ কোনটাই হচ্ছে না। সরকার সবকিছুর জন্য জণগনকে দায়ী করছে, আর জণগন সবকিছুর জন্য সরকারকে। অথচ ব্যর্থতা কিন্তু দুই পক্ষেরই আছে।

আবারও বলছি, করোনার কঠিন এক সময়ের মুখোমুখি আমরা। এই দেশকে, দেশের মানুষকে, দেশের অর্থনীতিকে আমাদের বাঁচাতে হলে নাগরিকদের এখন যেমন সচেতন হতে হবে, তেমনি সরকারকেও তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। কিন্তু আর কবে সেটা আমরা করবো? আর কতো ক্ষতি হলে, আর কতো লোক মরলে আমাদের বোধ ফিরবে? আর কতো লোক মরলে একটা সিস্টেম দাঁড়াবে। জানি না কোন কিছুই। শুধু রোজ দোয়া করি আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুক। ভালো থাকুক প্রিয় বাংলাদেশ।

সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Add your comment:

Related posts