বঙ্গোপসাগর চীনের সমান্তরাল লাইফলাইন

জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান।

চীনের সাথে বঙ্গোপসাগরের জিও স্ট্রাটেজিক আন্ত সম্পর্ক আলোচনা করতে হলে চীনকে সামনে রেখেই তা যেমন করতে হবে তেমনি এর সাথে মিয়ানমারের এবং বাংলাদেশের বিষয়ও আলোচনায় আসবে, আসবে ভারতও। আমরা জানি চীনের জ্বালানি সরবরাহের লাইফ লাইন ভারত মহাসাগর, মালাক্কা প্রণালী হয়ে দক্ষিণ চীন সাগর পাড়ি দিয়ে চীনের জ্বলানি পৌঁছে চীনে। তাহলে বঙ্গোপসাগরকে কেন চীনের জ্বালানি সরবরাহ ও মেরিটাইম সরবরাহের প্যারাল্যাল লাইফলাইন বলা হচ্ছে? আজকের আলোচনার মুল প্রতিপাদ্য এই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ জিও স্ট্রাটেজিক বিষয়কে নিয়ে।

বাংলাদেশ থেকে ১০০০ কিঃমিঃ সোজা দক্ষিণে মালাক্কা প্রণালীর প্রবেশমুখে ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। অতিসম্প্রতি ভারত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে তাদের নেভাল এ্যারবেজ কমিশনিং করেছে। এখানে ভারতের বিশাল শক্তিশালী এ্যারবেজও বিদ্যমান। ভারত ধীরে ধীরে ভারত মহাসাগরে তাদের নৌ ও বিমান শক্তির অপারেশনাল ক্যাপাবিলিটি বৃদ্ধি করছে।

আমরা ধরে নিতে পারি ভারত মহাসাগরে ভারতের নৌ এবং বিমান শক্তি বৃদ্ধি চীনকে ঘিরে। কারণ ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে এক চীন ছাড়া ভারতের নৌ ও বিমান শক্তির মোকাবেলা করার মতো কোনো শক্তির উপস্থিতি নাই। ভবিষ্যতে হয়তো ইন্দোনেশিয়া তেমন টক্কর দিলেও দিতে পারে। তবে যেহেতু ইন্দোনেশিয়া কালচারালি মহাভারতীয় কালচারের ধারক এবং মালাক্কা প্রণালীর মালিক মোখতার তাই ভারতের সাথে ইন্দোনেশিয়ার সংঘাতে জড়াবার সম্ভবনা নাই বলে মনে হয়। পরুন্তু ভারত চাইবে ইন্দোনেশিয়াকে ব্যাহার করে মালাক্কা প্রণালীতে চীনকে বেকায়দায় ফেলতে। এটা ভারত , ভারত মহাসাগরে ইন্দোনেশিয়ার মেরিটাইম সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করে করতে পারে। এক্সট্রিম ব্যাবস্থা হিসাবে ভারত হয়তো এটা করতে পারে। তবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে মেরিটাইম ব্যাবসায়ীক সংযোগ রক্ষা করতে ভারতেরও মাল্লাক্কা প্রণালী ব্যাহারের অপরিহার্যতা আছে। মাল্লাক্কা প্রণালীর অপর দেশ সিঙ্গাপুরকে চীন ভারতের বিপক্ষে দাঁড় করাতে পারবে মনে হয় না। কারণ সেখানে চীনা এবং ভারতীয় তামিলদের একটা অলিখিত জাতিগত ভারসাম্য বিদ্যমান।

আমরা দেখছি চীন বঙ্গোপসাগরে প্রভাব বিস্তার করতে রাখাইন প্রদেশের কাউকপায়ুতে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মান করেছে। এখান থেকে চীনের ইউনান প্রদেশে পাইপলাইন ও রোডলিঙ্ক স্থাপিত হয়েছে এবং হচ্ছে। ভবিষ্যতে চীন এই পোর্টকে ঘিরে এখানে একটি নেভালবেজ ডেভেলপ করবে এমন ধারণা বদ্ধমুল প্রায়। বর্তমানে এই গভীর সমুদ্র বন্দরে চীনের ৭২% মালিকানা আছে। ভবিষ্যতে মিয়ানমার মূল্য পরিশোধ করতে না পারলে এই পোর্ট চীনের মালিকানায় চলে যাবে।

মিয়ানমারের ইয়াংগুন থেকে ৪১৪ কিঃমিঃ দক্ষিণে মিয়ানমারের কোকো দ্বীপপুঞ্জ বিদ্যমান যেখানে মোট ৫ টি দ্বীপ রয়েছে। ৪ টি দ্বীপ সমন্বয়ে গ্ৰেট কোকো রিফ এবং ১ টি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ যা লিটিল কোকো রিফ নামে পরিচিত। গ্ৰেট কোকো রিফের উওরে মিয়ানমারের পেরিপারিস আইল্যান্ড এবং দক্ষিণে ভারতের ল্যান্ডফল আইল্যান্ড। এই সব দ্বীপসমুহ উওর পুর্ব বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত। শোনা যায় ১৯৯৪ সালে মিয়ানমার কোকো দ্বীপপুঞ্জকে চীনের কাছে লিজ দিয়েছে। যদিও মিয়ানমার তা অস্বীকার করে। চীন এখানে SIGINT স্থাপনার মাধ্যমে এই অঞ্চলে মেরিটাইম ও নেভাল মুভমেন্টের উপরে গোয়েন্দা নজরদারি করে এবং করছে।

আমরা আরো জানি শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা সুমুদ্র বন্দর এখন চীনের দখলে। যদিও শ্রীলঙ্কা বার বার বলছে চীন হাম্বানটোটাতে নেভালবেজ তৈরী করবেনা কিন্তু এটা পরিষ্কার যে চীন এখানে নৌশক্তি গড়ে তুলবে। এদিকে মালদ্বীপের গান আইল্যান্ডে চীন নেভালবেজ তৈরী করার পায়তারা করছে। এটা করা সম্ভব হলে ইঙ্গোআমেরিকান সামরিক ও এ্যারবেজ দিয়াগোগার্সিয়া চীনের হুমকির মুখে পড়বে।

এবারে মুল আলোচনায় আসবো। চীন পাকিস্তানকে গোয়াদারে নৌশক্তি স্হাপনের অনুমতি দিতে অনুরোধ করেছে। চীন যদি গোয়াদার এবং গান আইল্যান্ডে নৌশক্তি গড়ে তুলতে পারে তবে আরব সাগরে ভারতের মেরিটাইম মুভমেন্ট হুমকির মুখে পড়বে। এদিকে মালাক্কা প্রণালীর প্রবেশমুখে ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের উপস্থিতির কারণে একইভাবে চীনের মেরিটাইম মুভমেন্টও হুমকির মুখে আছে।

মিয়ানমারের গ্ৰেট কোকো রিফ, কাউইকপায়ু এবং হাম্বানটোটায় চীনের নৌশক্তির উপস্থিতি অনেকটা অকার্যকর অবস্থানে পড়েছে বঙ্গোপসাগরের শেষ দক্ষিণ ও ভারত সাগরের শেষ উওর অংশে ভারতের আন্দামান ও নিকোবর আইল্যান্ডে ভারতের নৌ ও বিমান শক্তির জোর উপস্থিতির ফলশ্রুতিতে। তদুপরি চীনের কোকো রিফ এবং আন্দামান ও নিকোবর আইল্যান্ড মুখোমুখি অবস্থানে থাকার ফলে এখানে চীন কিংবা ভারতের এ্যডভান্টেজ নেবার কোনো সুযোগ নাই।

চীন যদি আরব সাগরে ভারতের মেরিটাইম মুভমেন্ট হুমকিতে ফেলে আর ভারত যদি আন্দামান সাগরে এবং মাল্লাক্কা প্রণালীতে চীনের মেরিটাইম মুভমেন্ট বাঁধাগ্ৰস্থ করে তাহলে ভারত মহাসাগরে এবং দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে স্টেলমেট অবস্থার উদ্ভব হবে। এর অবসানের জন্য বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের জন্য একটি তৃতীয় নৌশক্তির উদ্ভব ঘটাতে হবে যা গেমচেঞ্জার হিসাবে স্থিতাবস্থার অবসান ঘটিয়ে চীনের বাঁধাহীন মেরিটাইম মুভমেন্ট নিশ্চিত করবে।

আমরা লক্ষ্য করলে দেখবো যে চীনের মেরিটাইম মেইন সাপ্লাই আর্টারি হচ্ছে দক্ষিণ চীন সাগর। এই দক্ষিণ চীন সাগরের প্রথম সামরিকি করণ করে চীন। চীন দক্ষিণ ও পুর্ব চীন সাগরে ৭টি মিলিটারি বেজ এবং রানওয়ে তৈরী করে এই সমস্যাসঙ্কুল দক্ষিণ চীন সাগরে নিজের সার্বভৌমত্ব দাবী করছে । যা ঐ অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে চীনের সংঘাতকে অনিবার্য করে তুলেছে। অদুর ভবিষ্যতে দক্ষিণ চীন সাগর সামরিক সংঘাত ও সংঘর্ষের ক্ষেত্র ভুমিতে পরিণত হবে এটা নিশ্চিত প্রায়। তখন দক্ষিণ চীন সাগর চীনের জন্য মেরিটাইম সরবরাহের নিরাপদ রুট থাকবেনা।

এই অবস্থায় চীনের জন্য অন্য একটি প্যারাল্যাল মেরিটাইম সাপ্লাই লাইফলাইন ওপেন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এই প্যারাল্যাল মেরিটাইম সাপ্লাই রুট যদি পাকিস্তানের গোয়াদার পোর্ট দিয়ে হয় তবে তা ইকোনমিক্যালি ভায়াবল হবেনা। গোয়াদার থেকে শিনজিয়াং এর দুরত্ত্ব ৩০০০ কিঃমিঃ। এই রাস্তা কারাকোরাম হাইওয়ে দিয়ে বিপদসঙ্কুল পথে গমনাগমন চীনের জন্য সহজলভ্য নয় এবং কখনো হবেওনা। তদুপরি চীন ও ভারতের মিলিটারি কলফ্লিক্টের ফ্লাস পয়েন্ট এখন লাদাখ অঞ্চলে ঘনিভুত হবার ফলে এই অঞ্চল চীনের প্যারাল্যাল লাইফলাইনের দাবী পুরণ করতে সক্ষম হবেনা বাস্তব কারণে।

আমরা যদি বঙ্গোপসাগরকে চীনের প্যারাল্যাল মেরিটাইম সাপ্লাই লাইফলাইন হিসেবে দেখতে চাই তবে প্রথমে আসে দূরত্বের কথা। কক্সবাজার থেকে কুনমিং এর দূরত্ব ১২০০ কিঃমিঃ। মালাক্কা প্রণালী থেকে বেজিং এর দূরত্ব ৪০০০ কিঃমিঃ। মালাক্কা প্রণালী থেকে চিটাগাং সমুদ্র বন্দরের দূরত্ব ২০০০ কিঃমিঃ। অর্থাৎ চীন যদি বঙ্গোপসাগরকে প্যরাল্যাল সপ্লাই লাইফলাইন হিসাবে গ্ৰহন করে তবে চীনের সামুদ্রিক দূরত্ব কমবে ২০০০ কিঃমিঃ।

এদিকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর, কক্সবাজার এবং আরো ডিপসি পোর্ট ডেভেলপ করে এই অঞ্চলকে চীন তার মেরিটাইম লাইফলাইনের হোল্ডিংগ্ৰাউন্ড হিসাবে গড়ে তুলে এখান থেকে স্থল ও আকাশপথে চীনের হার্টল্যান্ডের সাথে সংযোগ স্থাপন করে একটি প্যারাল্যাল মেরিটাইম সাপ্লাই লাইফলাইন ডেভেলপ করলে চীনের অভাবনীয় স্বাশ্রয় হবে। সেটা হবে সময় এবং অর্থের।

বাংলাদেশের জিও স্ট্রাটেজিক লোকোশন উওরে চিকেন নেকে ভারতকে দ্বীখন্ডিত করেছে। দক্ষিণে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের সেন্টার পয়েন্টে এর তটসীমাতে এই সাগরের শুরু এবং শেষ হয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণে যেভাবে ভুমি জেগে উঠছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের উপরে প্রভাব বিস্তার করবে।

বঙ্গোপসাগরকে চীনের প্যারাল্যাল সাপ্লাই লাইফলাইন হিসেবে ডেভেলপ করতে হলে চীনের জন্য প্রয়োজন এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে আরাকানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। কারণ এই আরাকানের কাইউকপায়ু দ্বীপে চীনের ডিপসি পোর্ট আছে। এর সাথে চট্টগ্ৰাম সি পোর্ট, কক্সেসবাজার এলাকা এবং আরো ডিপসি পোর্ট গড়ে তুলে এই অঞ্চলকে প্যারাল্যাল মেরিটাইম সাপ্লাই লাইফলাইনের উপযুক্ত করতে হলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হবে সবার আগে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আরো বেশি সময় থাকলে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিদেশী ষঢ়যন্ত্রের অবতারনা হবে তা নিশ্চিত। তারি ফলশ্রুতিতে যদি এই অঞ্চলে ইনসার্জেন্সি ওয়ারফেয়ার শুরু হয় তবে সব চেয়ে ক্ষতিগ্ৰস্ত হবে চীন। তখন এই অঞ্চলে এমন এক যুদ্ধের সূচনা হবে যার সমাধান তখন আর চীনের হাতে থাকবেনা। ফলে বঙ্গোপসাগরকে দক্ষিণ চীন সাগরের প্যারাল্যাল মেরিটাইম সপ্লাই লাইফলাইন হিসেবে ব্যাবহারের চীনের সব উদ্যোগ ভেস্তে যাবে এটা নিশ্চিত।

একটা বিষয় চীনকে মনে রাখতে হবে রোহিঙ্গাদের দিয়ে আরাকানে স্বায়ত্ত্ব শাসনের আলোকে একটি সমাধানে এসে শান্তি স্থাপন করা এবং মিয়ানমারের ১০০ টি এ্যাথনিক গ্ৰুপকে অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা দিয়ে মিয়ানমারকে দুর্বল রেখে চীনের বঙ্গোপসাগরকে প্যারাল্যাল লাইফলাইনে রুপান্তরিত করার কথা চিন্তা করতে হবে। চীনকে মিয়ানমারের উপরে স্থায়ী গভীর প্রভাব বিস্তার করেই ভবিষ্যতের পথের কথা চিন্তা করা চীনের জন্য লাভজনক। শক্তিশালী মিয়ানমার চীনের জন্য লাভজনক নয়। মিয়ানমারকে মধ্যস্থলে সামরিক ভাবে শক্তিশালী রেখে বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রভাব বিস্তার নিষ্কন্টক হবেনা। মিয়ানমার দুর্বল থাকলে এক ভারত ছাড়া মিয়ানমারের পাশে এমন কোন দেশ নাই যা মিয়ানমারকে সামরিক সহয়তা দিয়ে শক্তিশালী করতে পারে। এদিক থেকে বাংলাদেশকে সামরিক ও নৌশক্তিতে শক্তিশালী করতে পারলে মিডিল কিংডম হিসাবে বাংলাদেশ উওরে এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে চীনের স্বার্থ পূর্ণভাবে দেখভাল করতে সক্ষম হবে। যা মিয়ানমারের দ্বারা চীনের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়।

সাবেক বিডিআর প্রধান।

Add your comment:

Related posts