আরাকান ও চীন নিয়ে বাড়তি ভাবনা

মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান।

কান টানলে মাথা আসে। এটা পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারত উপমহাদেশের প্রবাদ। প্রবাদ হলো অভীজ্ঞতার নিয্যাস। যেহেতু আমি জিও স্ট্রাটেজি নিয়ে আলোচনা করছি তাই এখানে কানের সঙ্গে মাথা বলতে বুঝাবে উওর পুর্ব ভারতের ৭ রাজ্য এবং উওর পশ্চিম মিয়ানমার। এটাকে আমি আখ্যায়িত করবো গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল বা সোনালী ত্রিভুজ হিসাবে। এই স্বর্ণত্রিভুজের ধারনা অনেক পুরানো। অতীতে এই ধারনার সাথে অন্তর্ভুক্ত ছিল বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামও।

এই স্বর্ণত্রিভুজে মিয়ানমারের খুনসা মাদক উৎপাদন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের রুট ব্যাহার করে তা ইউরোপ ও আমেরিকায় সরবরাহ করতো। এমন ধারনা পশ্চিম দুনিয়াতে আছে। আমি তখন মহাপরিচালক বিডিআর। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন ২০০০ সালের ২০ মার্চ সোমবার ঢাকা ভ্রমন করেন।
একদিনের ভ্রমন শেষে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন ফিরে যাবার পরে আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা প্রধান ও তাঁর টিমের সাথে আমার দীর্ঘ বৈঠক হয় বিডিআর সদরে আমার অফিসে। আমি তাঁকে বুঝাতে সক্ষম হই যে খুনসাকে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাদক চালান ও মাদক উৎপাদন করা থেকে বিরত করতে হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছেড়ে আসা ক্যাম্পসমুহে বিডিআর নিয়োগ করতে হবে। কারণ ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রামের চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্যাম্পসমুহ থেকে সেনাবাহিনী সেনানিবাসে ফিরে আসবে।

আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয় পার্বত্য চট্টগ্রামে বাড়তি সেক্টর, বাড়তি বিডিআর ব্যাটালিয়ন রেইজ করতে হবে। সাথে ১টি সীমান্ত কমান্ড স্থাপন করা হবে চট্টগ্ৰাম সেনানিবাসে। আরো সিদ্ধান্ত নেয়া হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের সব বিডিআর ক্যাম্প হেলিকপ্টারের সহায়তার আওতায় আনা হবে। এই হেলিকপ্টার যা প্রয়োজন আমেরিকা সরবরাহ করবে। এর জন্য যে খরচ হবে তাও আমেরিকা বহন করবে। আমরা আরো সিদ্ধান্ত নেই প্রাথমিক ভাবে ২৫ জন অফিসার আমেরিকাতে মাদক বিরোধী প্রশিক্ষণ গ্ৰহন করবে। পরে আমেরিকার সৈনিকরা বাংলাদেশে এসে বিডিআর সৈনিকদের প্রশিক্ষণ দেবে। মিটিং শেষে বেরিয়ে যাবার সময় আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা প্রধান আমার ঘাড়ে হাত রেখে বললেন General You got everything.

এই মিটিং এর পরে আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিজিট করি। পরিকল্পনা অনুযায়ী জিওসি ২৪ পদাতিক ডিভিশনের হেলিকপ্টারে আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের থেগাখাল বরাবর উওর দক্ষিণে ক্যাম্প স্থাপনের সম্ভাব্য স্থানসমুহ পরিদর্শন করি। পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিদর্শন শেষে পিলখানায় ফিরে নির্দেশমতো সেনা প্রধান জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমানকে সব অবহিত করি। তিনি সব বিষয়ে সহমত পোষণ করেন।‌ তবে তিনি সীমান্ত কমান্ডকে সীমান্ত সদর নাকরন করতে বলেন।

সেনাবাহিনী প্রধানের সাথে কথা শেষে অফিসে ফিরে শুনি ভারতীয় দুতাবাসের সামরিক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার লাহেড়ি সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাঁকে আমি খুব উদ্বিগ্ন দেখলাম। সাক্ষাতে বললেন আমরা কেন পার্বত্য চট্টগ্রামে এতো বিডিআর শক্তি বৃদ্ধি করছি। আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম ভারতের চিন্তিত হবার কোন কারণ নাই। তাঁকে বললাম পার্বত্য চট্টগ্রামে মাদক নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ ভারত উভয় দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে।

এসব বলার উদ্দেশ্য হলো স্বর্ণত্রিভুজে আমেরিকার যেমন তেমনি ভারতের স্বার্থ সমভাবে বিদ্যমান। সবাই এখানে হস্তক্ষেপ করতে চায়। এমনকি এই স্বর্ণত্রিভুজ ঘিরে খৃষ্টান অধ্যুষিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি পরিকল্পনা পশ্চিমা খৃষ্টান বিশ্বের আছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের ব্রেকওয়ে গ্রুপের বিচরণ এখানে সব সময় ছিল এখনও আছে। এই স্বর্ণত্রিভুজ অনিয়ন্ত্রিত থাকলে এই অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা অধরা থেকে যাবে। এই অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা অধরা থাকলে ক্ষতি বেশী হবে‌ চীনের। চীন যদি বঙ্গোপসাগরকে তাদের সমান্তরাল সাপ্লাই লাইফলাইন হিসাবে ব্যবহার করতে চায় তাহলে চীনকে এই স্বর্ণত্রিভুজে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে।
স্বর্ণত্রিভুজে শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের প্রথম পদক্ষেপ হবেঃ

১।‌ রোহিঙ্গাদের অতিসত্বর আরাকানে ফিরিয়ে নিয়ে মিয়ানমারের শিথিল নিয়ন্ত্রণে একটি স্বয়ত্বশাসিত আরাকান প্রতিষ্ঠা করা। এটা করা সম্ভব হলে চীনের সমুহ লাভ হবে। কারণ যে অত্যাচার বার্মিজরা রোহিঙ্গাদের উপরে করেছে তারা কোনোদিন বর্মীদের বন্ধু হিসাবে গ্ৰহন করবেনা। বর্মীদের বিশ্বাস করবেনা। ডিভাইড এ্যান্ড রুল এই পদ্ধতি আরাকানে চীনের জন্য অতীব ফলদায়ক হবে।

২। স্বর্ণত্রিভুজের উওর পশ্চিম মিয়ানমারের অংশে চীনের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৩। উওর পূর্ব ভারতের ৭ রাজ্য এবং বাংলাদেশের অংশকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে একটি বহুমুখী বানিজ্যিক নেটওয়ার্কের আওতায়।

৫। নেপাল, সিকিম, ভুটান, উওর পূর্ব ভারতের ৭ রাজ্য এবং বাংলাদেশকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ব্যাবসা ও বানিজ্যের নেটওয়ার্কের মধ্যে এনে অন্ততত দু’টি চীন, বাংলাদেশ ও ভারত অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপনের পদক্ষেপ নিতে হবে চীনকে।

একটা বিষয় মনে রাখতে হবে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী দেশের মধ্যে যুদ্ধ কোনোক্রমেই কাম্য হতে পারেনা। এই যুদ্ধে মিউচুয়াল ডেস্ট্রাকশন হবে কল্পনাতীত। তদুপরি আমি আগের লেখায় বলেছি এখন অল আউট ওয়ার বলে আর কিছু নাই। তবে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী দেশ বা দেশসমূহের মধ্যে বানিজ্য যুদ্ধ হতে পারে। ব্যাপক বানিজ্যিক বিনিয়োগের মাধ্যমে এক দেশ অপর দেশকে প্রভাবিত করে কাঙ্খিত লক্ষ বিনা যুদ্ধে অর্জন করতে সক্ষম হবে।
তদুপরি আঞ্চলিক দেশসমূহের সাধারণ জনগণ ব্যাবসা বানিজ্যে ব্যাপক ভাবে নিয়োজিত হবার ফলে মানুষের জীবন মানের যেমন উন্নয়ন হবে তেমনি আঞ্চলিক দেশসমূহের জনগনের মধ্যে আন্ত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ফলে একে অপরের প্রতি আন্ত নির্ভরশীল হবার ফলে যুদ্ধের সম্ভাভনা ধীরে ধীরে তিরোহিত হবে যা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ও বিশ্বশান্তির পথ উম্মোচিত করবে।

গালওয়ান ভ্যালি নিয়ে চীনের সাথে ভারতের সর্বাত্বক যুদ্ধ ভারতের জন্য কোনো লাভজনক ফল বয়ে আনবেনা। আমি বলবো এতে ভারত ও চীনের অর্জন হবে শুন্য। চীন এবং ভারত উভয় দেশকে উপলদ্ধি করতে হবে দেশের সীমান্ত বৃদ্ধি করে কোনো লাভ নাই যদি না তা কষ্ট এ্যাফেক্টিভ হয়। দেশের সাধারণ মানুষের জন্য উপকারী না হয়।

সিয়াচীন গ্লেসিয়ার আমি ভ্রমন করেছি, আযাদ কাশ্মীরের চিকুঠি সীমান্ত পোষ্ট আমি অবলোকন করেছি পাকিস্তান অংশে দাঁড়িয়ে। ঐসময় আমি উপলদ্ধি করেছিলাম এটা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শতবছর আগের ফেলে আসা সামন্তবাদী চিন্তার বিষফল। এর বলী হচ্ছে দেশের সাধারণ সৈনিক। এতে কোনো দেশের কোনো লাভ নাই।
যে রাজনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনায় দেশের সাধারণ মানুষের লাভ হয়না সে পরিকল্পনা পরিত্যাজ্য। এই পরিত্যাজ্য বিষয়গুলো নিয়ে অঞ্চলিক শক্তিধর দেশসমুহকে এখন ভাবতে হবে। ভাবতে হবে দেশের ভিতরে কোনো বিশেষ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে দলিত মোথিত করে দেশের কোনো উপকার হয়না। আজকে আরাকান যদি স্বাধীন কিংবা স্বায়ত্ব শাসন অর্জন করে এর জন্য দায়ী মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, সরকার ও মুসলিম বিদ্বেষী বর্মী জনগন।

আজকে চীন যে গালওয়ান ভ্যালিতে অভিযান চালিয়ে তা দখল করেছে তার জন্য দায়ী ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপ সরকার। মোদী সরকার যদি জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল না করতো, যদি কাশ্মিরকে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে বিভাজিত না করতো তাহলে চীনের তরফ থেকে কোনো আগ্ৰাসন হতোনা।

সব কেন’র পিছনে কারণ থাকে। আজ ভারত কাশ্মিরের উপরে যে অন্যায় করেছে তার কাফফারা ভারত দিচ্ছে। আর কাফফারা নয়, আর যুদ্ধ নয়।আমরা চাই এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। সব সমস্যার সমাধান হোক। প্রসার ঘটুক ব্যাপক ব্যাবসা বানিজ্যের। জীবন মানের উন্নয়ন ঘটুক দেশের সাধারণ মানুষের।

সাবেক বিডিআর প্রধান।

Add your comment:

Related posts