উপমহাদেশের জিও স্ট্রাটেজি কিছু ভবিষ্যৎ ভাবনা

মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান।

“The greatest victory is that which requires no battle”.
Sun Tzu, The Art of War

বড় বিজয় যা বিনা যুদ্ধে অর্জিত হয়।

এমন ঘটনা কি পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশে অতিসম্প্রতি ঘটেছে? এর অভিঘাত তরঙ্গ কিভাবে উপমহাদেশের দেশসমূহকে প্রভাবিত ও আচ্ছন্ন করেছে তানিয়ে আলোচনা করবো। এই আলোচনাতে আমি চীনকে এই উপমহাদেশের অংশ ঘোষণা করে আলোচনায় অগ্ৰসর হবো।
আমার অতীব প্রিয়ভাজন ইমরান চৌধুরী গতকাল আমাকে বলেছে আমি যেন লেখাটা হিউমার দিয়ে শুরু করি। তাঁর হয়তো মনে হয়েছে জিও স্ট্রাটেজির মতো কাঠখোট্টা বিষয় রসেভরা রসগোল্লার মতো উপস্থাপিত হলে পড়ুয়ারা মুখে দিলে সুড়ুৎ করে পাকস্থলীতে চালান হয়ে যাবে। তার কথাই রাখছি। ভারতের দুই গুনিজন ও বিখ্যাত বাঙ্গালিকে নিয়ে একটি রসাত্বক আলোচনা দিয়ে লেখার শুভারম্ভ করছি‌।

আমরা জানি ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় মহা পন্ডিৎ ব্যাক্তি ছিলেন। তিনি বিষয়ী ছিলেননা বলে তাঁর সংসারে সচ্ছলতা ছিল না। পক্ষান্তরে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যেমন ছিলেন বিষয়ী তেমনি ছিলেন উচ্চ পদস্থ ব্রটিশ সরকারের আমলা। ১৮৫৮ সালে অর্থাৎ সিপাহী বিদ্রোহের (১০ মে ১৮৫৭- ১ নভেম্বর ১৮৫৮ ) সময়ে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে যশোরের ডেপুটি কালেক্টর নিয়োগ দেয়‌। পরে তিনি পদোন্নতি পেয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হন। এই পদে চাকরি শেষে ১৮৯১ সালে অবসর গ্ৰহন করেন।
তো একদিন ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁর জ্বরাজির্ণ অনেক দিনের পুরাতন চামড়ার চটি পাঁয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। চামড়ার চটি পুরোনো হলে বাঁকা হয়ে যায়। ফলে হাঁটার সময় পাঁ যেখানে পড়ছিলো ওখানে চটি ছিলনা । তাই দেখলে মনে হবে চটি আগে আগে যাচ্ছে আর পাঁ চটির বাইরে। ভাগ্যের ফের ঐ সময় ঐ রাস্তা দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাসায় ফিরছিলেন। দুজনের সাক্ষাৎ হলো। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়কে রসিয়ে বললেনঃ
বঙ্কিমচন্দ্রঃ কিহে তোমার চটিতো সাগর পানে ধায়। অর্থাৎ ঈশ্বর চন্দ্রের চটি যেন বাঁকা হয়ে তাঁর মুখের দিকে যাচ্ছে। শুনে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর বঙ্কিমচন্দ্রকে বললেন।

ঈশ্বর চন্দ্রঃ চাটুয্যে বৃদ্ধ হলে এমন বঙ্কিম হয়ে যায়।
সাগরের কথা যখন আসলই তখন একটু গভীর ভাবে লক্ষ্য করলে প্রতিভাত হবে যে ভারত মহাসাগর, আরব সাগর ও বঙ্গপোসাগরে সানজ্যুর থিওরি অনুযায়ী চীন যথাক্রমে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কাউয়ুকপায়ু, গ্ৰেট কোকো রিফ, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা ও পাকিস্তানের গোয়াদারে গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনে সক্ষম হয়ে চীন এই তিন সাগর ও মহা সাগরে ভারতের উপরে বিনাযুদ্ধে বিজয় লাভ করেছে। আমরা মানি এবং নাই মানি এটাই বাস্তবতা।
প্রত্যেক দেশের কোর মিলিটারি পলিসি বা ডক্ট্রিন থাকে । ইউএস পলিসি হলো যদি আমেরিকা কোনো কারণে কোনো দেশ দ্বারা থ্রেটেন ফিল করে তবে আমেরিকা সেই দেশকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেবে। এর জন্য আমেরিকা কারো কাছে কোনো জবাবদিহি করবেনা। যখন চীন কাইউকপায়ুতে, গ্ৰেট কোকো রিফে গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপন করেছিল তখন ভারত, ভারত মহাসাগরে চীনের তরফ থেকে হুমকির সম্মুখিন হয়নি। কারণ এর বিপরীতে ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ভারতের নৌ ও বিমান শক্তি চীনের থ্রেট মোকাবেলা করতে প্রস্তুত ছিল।

চীন যখন শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা লীজ নিলো তখন ভারত , ভারত মহাসাগরে হুমকির সম্মুখীন ফিল করলোনা এটা ভাবতে অনেকবার হোঁচট খেয়েছি। ভারতের এ্যাডমিরালরা কি ভেবেছিলেন তখন এনিয়ে এর কোনো সমাধানে পৌঁছতে পারেনি। পাকিস্তানের গোয়াদারে চীনের গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপন ভারতের পক্ষে ঠেকানো সম্ভব ছিল না হয়তোবা এটা মানা যেতে পারে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে ভারতের পক্ষে হাম্বানটোটার লীজ বন্ধ করার সব সামরিক পদক্ষেপ গ্ৰহন করা সম্ভব ছিল।
এখন পর্যন্ত এই হুমকি মোকাবেলা করার বিকল্প কোনো স্ট্রাটেজি আমরা দেখছিনা ভারতের তরফ থেকে। ইতিমধ্যেই শ্রীলঙ্কার ট্রিঙ্কোমালিতে গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের পদক্ষেপ ভারতের গ্ৰহন করা উচিৎ ছিল বলে মনে করি। যাতে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে শক্তির ভারসাম্য রক্ষিত হয়।

এবারে আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চাই। ভারতের উওরে চীন পশ্চিমে আরব সাগর এবং পাকিস্তান। এর ভিতরে নেপাল, ভুটান ও বাংলাদশ। ভিতরে বঙ্গপোসাগর, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর , শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। আমরা লক্ষ্য করেছি ভারত , ভারত মহাসাগরের রিম কান্ট্রি বা তটসীমার দেশসমূহের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা নিয়েছে। গঠিত হয়েছেঃ
https://photos.app.goo.gl/KZrrsfGn8VRgdnba9
এই সংগঠনের মোট দেশের সংখ্যা ২২ টি।‌ গঠিত হয়েছেঃ
https://photos.app.goo.gl/SEHAqeNjMrezA17s7

এসব যেমন ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় গঠিত হয়েছে তেমনি ভারতে প্রত্যক্ষ অসহযোগিতায় মৃত্যু বরণ করছে সার্ক। ভারতে এই সব উদ্যোগকে আমি ” ঘরে আয়না রেখে কুঁয়ায় মুখ দেখতে যাওয়ার” সাথে তুলনা করি। ঘরের আয়না সার্ককে গলাটিপে মেরে ফেলে ভারত এখন কুঁয়ায় মুখ দেখে বেড়াচ্ছে। এটা ঠিক ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের চটির মতো পাঁ যেখানে পড়ছে সেখানে চটি নাই‌।

সার্কের পুনরুজ্জীবিত হওয়া ভারতের মঙ্গলের জন্য অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। কেন? বলবো।‌ চীন -পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপিত হয়েছে। এই অর্থনৈতিক করিডোরে চীন- পাকিস্তানের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৬৪ বিলিয়ন ডলার। এই করিডোর থেকে পাকিস্তানের বাছরে আয় হবে ৬-৮ বিলিয়ন ডলার। পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের গোয়াদারে চীন স্থাপন করেছে গভীর সমুদ্র বন্দর। যা ইতিমধ্যেই আলোচিত হয়েছে। যা আলোচনা হয়নি তাই বলছি। চীন গয়াদারে কাজের জন্য চীনা নাগরিকদের বেলুচিস্তানে নিয়ে এসে বসতি গড়ছে। অনেকেই মনে করছেন আগামী ২০/ ৩০ বছরের মধ্যে বেলুচিস্তানের স্থানিয় জনগন চীনাদের কাছে সংখ্যালঘুতে পরিনত হবে।
ভারত নিজে মনে করে‌ চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর পাকিস্তানের জন্য চীনের একটি ঝৃণের ফাঁদ। যে ফাঁদে পাকিস্তান পাঁ দিয়েছে। ধরে নিলাম এই ঝৃণের ফাঁদে আটকা পড়ে পাকিস্তান দুর্বল দেশে পরিনত হলো। তাতে কি ভারতের লাভ হবে? এই ক্ষেত্রে ঝৃণের ফাঁদে পাঁ গলিয়ে পাকিস্তান যদি অর্থনৈতিক ও সামরিক ভাবে হিনবল হয়ে পড়ে তবে চীন পাকিস্তানকে মরতেও দেবেনা বাঁচতেও দেবেনা। তখন চীন এই ইকনোমিক করিডোর দিয়ে পাকিস্তানে চীনের সামরিক বাহিনীকে মুভ করিয়ে সমস্ত পাকিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করবে। এখন চীন আছে ভারতের উওরে । পাকিস্তানে সামরিক ঘাঁটি তৈরী করে চীন তখন ভারতকে উওর ও উওর পশ্চিম দিক দিয়ে ঘিরে ফেলবে। তখন চীনের নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র ভান্ডার চলে যেতে পারে। এটা দেখার জন্য ভারতের কি আরো অপেক্ষা করার সময় আছে? এখন শ্রীলঙ্কা গেছে, নেপাল গেছে । তখন যাবে পাকিস্তান। থাকবে সবেধন লীমমণি বাংলাদেশ।

দেখার চেষ্টা করবো বাংলাদেশ চীনের প্রভাব বলয়ে গেলে কি ঘটতে পারে ভারতের উপরে চীনের তরফ থেকে? এখানে বাংলাদেশের বাংলাবান্ধা থেকে উওরের নেপাল, ভুটান ও সিকিমের দুরত্ব দেখার চেষ্টা করবোঃ
https://photos.app.goo.gl/dwDGSF8s7peY9ghL6
https://photos.app.goo.gl/7NH5D9pENXW2tphH6
https://photos.app.goo.gl/9h92TE6Kk5qc3Pn66
https://photos.app.goo.gl/jgum7tq5Dyn2LHoBA
আমি এই লেখা নিয়ে চিন্তা করার সময় ভাবছিলাম বাংলাবান্ধা থেকে মাত্র ১২৬ কিলোমিটার দুরে বরফ পড়ে। এটা যেমন সত্য তেমনি নাথুলা গীরিপথ দিয়ে ১৮০ কিলোমিটার রাস্তা ৬ ঘন্টা ৯ মিনিটে পাড়ি দিয়ে চীন বাংলাবান্ধা পৌঁছলে তারও কম সময়ে বাংলাদেশের সমতল ভুমি ব্যাবহার করে চীন ভারতের বিহার ও পশ্চিম বঙ্গের সীমান্তে পৌঁছে যেতে পারবে। এই স্ট্রাটেজিক মিলিটারি ম্যানুভার যদি ভারতের বিপক্ষে চীন করে তবে উওর পুর্ব ভারতের ৭ রাজ্য কাটা পড়ে অরক্ষিত হয়ে পড়বে। ধরে নিলাম ভারতের চিকেন’স নেকে চীনের সাথে ভারতের অল আউট ওয়ার হলো।‌ সেক্ষেত্রেও বাংলাদেশ যদি চীনের এ্যানভিল বা চীনের হাতুড়ির নেহাই হিসাবে ব্যাবহার হয় তাহলে চিকেন’স নেকের যুদ্ধে চীনের বিরুদ্ধে ভারতের জয়ের আশা নাই বললেই চলে।

হলে ভারতের করণীয় কি? এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতকে গভীর ভাবে ভাবতে হবে ভারত নিজের ঘরের আয়নায় মুখ দেখবে নাকি কুঁয়াতে? ভারতকে ভাবতে হবে এতো দিন পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানের সাথে যে পলিসিতে কাজ করেছে তা ছিল সম্পুর্ন ভুল পলিসি। দুর্বল পাকিস্তান ভারতের জন্য মৃত্যুবাণ হিসাবে আবির্ভূত হবে। পাকিস্তান কিকরে চীনের ঝৃণের ফাঁদে না পড়ে তা ভারতকে নিশ্চিত করতে হবে। একি সাথে পাকিস্তানের সাথে সব সমস্যার সমাধানের পথে অগ্ৰসর হতে হবে ভারতকে। এর জন্য পাকিস্তানের সাথে ডায়লগ শুরু করতে পারে ভারত। পাকিস্তানের সাথে ভারতের বড় সমস্যা হচ্ছে কাশ্মীর ইস্যুতে। আমি কাশ্মীর সমস্যার একটা সম্ভাব্য সমাধানের পথের কথা বলেছি। এটা নিয়ে ভাবা যেতে পারেঃ
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=10218686534977212&id=1313709533

শ্রীলঙ্কার সাথে শান্তির পথ অনুসন্ধানে রত হতে হবে ভারতকে। তবে শ্রীলঙ্কা সহমত নাহলে ভারতকে তার কোর মিলিটারি ডক্ট্রিনের আওতায় যা করণীয় করতে হবে। ভারতকে নেপালের সাথে শান্তির পথ অনুসরণের পরামর্শ আমার। কারণ নেপাল এখন ল্যান্ড কানেক্টেড দেশ চীনের সাথে। ভুটানকে বিকশিত হতে দিতে হবে ভারতকে। এটাই সময়ের দাবী।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের নিজের সৃষ্ট সমস্যার মধ্যে আছে সীমান্তে মানুষ হত্যা। এটা বন্ধ করতে হবে। বানিজ্যিক অসামঞ্জস্যতা শুণ্যে নামিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে হবে ভারতকে। অবৈধভাবে বাংলাদেশে আছে কাজ করছে এমন ভারতীয় নাগরিকদের ভারতকে ফিরিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরিণ বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

এক কথায় এই উপমহাদেশের ছোট অথচ ভারতের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ দেশ যেমন পাকিস্তান, বাংলাদেশ , নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপের সাথে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক উভয় ক্ষেত্রে শান্তির সম্পর্ক উন্নয়নের পথে ভারতকে এক্ষুনি উদ্যোগ গ্ৰহন করতে হবে।

পরিশেষে বলবো ভারত জিও স্ট্রাটেজিক্যালি মুসলিম দেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি দেশ। নিজ দেশের মুসলমানদের উপরে অত্যাচার ভারতের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না। এটা ভারতকে বুঝতে হবে। অদূর ভবিষ্যতে এই উপমহাদেশে যে পরিবর্তন আমরা দেখছি সেই টক্কর মোকাবেলা করার পদক্ষেপ সম্মিলিত ভাবে গ্ৰহন করতে হবে। আমরা মনে করি শক্তির ভারসাম্য, অবাধ বাণিজ্য , শান্তি ও সহবস্থানের নীতি এই উপমহাদেশের উন্নয়ন এবং নিরাপত্তার একমাত্র চাবিকাঠি।

সাবেক বিডিআর প্রধান।

Add your comment:

Related posts